আয়কর রিটার্নে করছাড়ের সুযোগ শেষ হচ্ছে আজ

স্টাফ রিপোর্টার

আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দিয়ে করছাড় পাওয়ার সুযোগ শেষ হচ্ছে আজ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর)। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা—যেটি কম, সেই পরিমাণ করছাড় পাবেন করদাতা। চলতি বছরের বাজেটে করদাতাদের দ্রুত রিটার্ন জমায় উৎসাহিত করতে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তবে এ ছাড়ের সুযোগ সবাই পাবেন না। পুরো বছরের মোট করের ওপর এই ৫ শতাংশ ছাড় প্রযোজ্য নয়। রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যে কর পরিশোধ করা বাকি থাকবে, মূলত সেই ‘ট্যাক্স পেয়েবল’-এর ওপরই ছাড় হিসাব হবে। ফলে সারা বছর নিয়ম মেনে অগ্রিম কর, উৎসে কর বা পেরোল ট্যাক্স পরিশোধ করে আসা করদাতাদের জন্য এ সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে কার্যত কমে যেতে পারে, এমনকি শূন্যও হতে পারে।

ধরা যাক, আশিক উদ্দিন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত তার করযোগ্য আয় ৭ লাখ টাকা। প্রথম ৪ লাখ টাকার ওপর কর নেই। বাকি ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে তার কর দাঁড়ায় ৩০ হাজার টাকা। তিনি যদি আজ ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে ওই কর পরিশোধ করেন, তাহলে ৩০ হাজার টাকার ৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৫০০ টাকা করছাড় পাবেন। ফলে তাকে পরিশোধ করতে হবে ২৮ হাজার ৫০০ টাকা।

 

এ বিষয়ে কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়ের বিধান করা হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এই ছাড় রিটার্ন জমার সময় যে কর দেওয়া বাকি থাকে, অর্থাৎ ট্যাক্স পেয়েবলের ওপর প্রযোজ্য। সারা বছরের মোট করের ওপর নয়।কিন্তু একই করদাতা যদি সারা বছর বেতন থেকে উৎসে কর দিয়ে থাকেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলার সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়ে থাকে কিংবা ব্যাংকের এফডিআরের মুনাফা থেকে উৎসে কর কাটা হয়ে থাকে, তাহলে এসব পরিশোধিত করের ওপর আলাদা করে ৫ শতাংশ ছাড় মিলবে না। বরং মোট কর থেকে এসব কর সমন্বয়ের পর রিটার্ন জমার সময় যে অর্থ পরিশোধযোগ্য থাকবে, ছাড়ের হিসাব হবে সেই টাকার ওপর।

তার মতে, এর ফলে যারা সারা বছর নিয়ম মেনে কর পরিশোধ করেছেন, তারা এই ছাড় থেকে খুব কম সুবিধা পেতে পারেন বা কোনো সুবিধাই নাও পেতে পারেন। অন্যদিকে আগে কর পরিশোধ না করা করদাতার রিটার্নে পরিশোধযোগ্য কর থাকলে তিনি ছাড় পাওয়ার সুযোগ পাবেন। সারা বছরের মোট করের ওপর ছাড় হিসাব করা হলে করদাতারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতেন বলে তিনি মনে করেন।

রিটার্ন দাখিলে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
গাড়ি বা দামি জিনিস কেনা, আয়-ব্যাংক-সম্পদ থেকে বিদেশভ্রমণ, পরিবারের লেনদেন অস্বাভাবিক হলেই হতে পারে অডিট।

জানা গেছে, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার করনথি অডিটে ফেলার জন্য প্রাথমিকভাবে ৩৯টি বিষয় চিহ্নিত করেছে আয়কর বিভাগ। এমন বাস্তবতায় করদাতার সামনে এখন শুধু ‘কত টাকা আয় করেছেন’ এটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। বরং এই আয়ের উৎস কী, খরচের উৎস, জীবনযাত্রার ধরন, কোথায় বিনিয়োগ করেছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কত টাকা ঘুরেছে, পরিবারের কার নামে কী সম্পদ আছে-এসবেরও ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।

শুধু ছাড়ের হিসাব নয়, রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তথ্যের সামঞ্জস্য নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে করদাতাকে। কেননা আয়কর রিটার্ন এখন শুধু করদাতার নিজের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করছে না। ব্যাংক লেনদেন, বিনিয়োগ, সম্পদ, উৎসে কর, ব্যবসায়িক নিবন্ধন, শেয়ারবাজার, পারিবারিক লেনদেনসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্যও কর কর্তৃপক্ষের কাছে থাকতে পারে।

রিটার্নে আয় কম দেখানো হলেও ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক বেশি লেনদেন থাকলে তার ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে। তবে ব্যাংকে থাকা সব অর্থই যে করযোগ্য আয়, বিষয়টি এমন নয়। ব্যবসার মূলধন, আগের সঞ্চয়, ঋণের অর্থ, অন্যের হয়ে করা লেনদেন কিংবা সম্পদ বিক্রির অর্থও ব্যাংক হিসাবে থাকতে পারে। কিন্তু রিটার্নে ঘোষিত আয় ও ব্যাংক লেনদেনের মধ্যে বড় ধরনের অমিল থাকলে অর্থের উৎসের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে।

ঠিক একইভাবে আয় ও সম্পদের মধ্যেও সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি বা গাড়ি কেনা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, এফডিআর বা ডিপিএসের পরিমাণ বৃদ্ধি—এসবের সঙ্গে ঘোষিত আয় ও অর্থের উৎসের সামঞ্জস্য না থাকলে তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল ব্যক্তি বা আত্মীয়ের সঙ্গে ঋণ, উপহার, অর্থ স্থানান্তর কিংবা সম্পদ হস্তান্তরের তথ্য রিটার্নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। কোনো নির্ভরশীল ব্যক্তির নিজস্ব পর্যাপ্ত আয় না থাকলেও তার নামে উল্লেখযোগ্য সম্পদ থাকলে সেই সম্পদের উৎসও প্রশ্নের বিষয় হতে পারে।

 

বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে শিক্ষা বা চিকিৎসা ব্যয়, বিদেশি ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বা বিনিয়োগের তথ্যের সঙ্গেও ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ক্রেডিট কার্ডে অস্বাভাবিক ব্যয় বা উচ্চমূল্যের পণ্য-সেবা কেনার পরিমাণ ঘোষিত আয় ও ব্যক্তিগত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সেটিও নজরে আসতে পারে। এ ধরনের তথ্য ব্যাংকের সঙ্গে লাইভ শেয়ারিংয়ের ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিদেশে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ, বিনিয়োগ বা ব্যবসায়িক স্বার্থের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলেও তা রিটার্নে যথাযথভাবে ঘোষণা না করা ঝুঁকির আরেকটি ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হবে অডিট।

আর ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির ক্ষেত্র আরও বেশি। বিক্রি বাড়লেও করযোগ্য আয় কমে যাওয়া, বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়েও ব্যবসা চালু রাখা, ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহ ও সম্পদ বাড়ানো, বড় ব্যাংক লেনদেনের বিপরীতে কম করযোগ্য আয় দেখানো কিংবা উৎসে কাটা করের তথ্যের সঙ্গে রিটার্নের গড়মিল—এসব বিষয় অডিটের জন্য বিবেচিত হতে পারে।

চলতি বছর ২০২৩-২৪ করবর্ষের ৯২ হাজার ৮৪৯টি রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত করেছে এনবিআর। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তিন ধাপে এসব রিটার্ন নির্বাচন করা হয়। প্রথম ধাপে ১৫ হাজার ৪৯৪টি, দ্বিতীয় ধাপে ৭২ হাজার ৩৪১টি এবং তৃতীয় ধাপে ৫ হাজার ১৪টি রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে। এনবিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় বাছাইয়ের উদ্দেশ্য হলো কর ফাঁকি বা অসঙ্গতির সম্ভাবনা বেশি এমন রিটার্ন চিহ্নিত করা।

তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অডিটের জন্য নির্বাচিত হলেও পরবর্তী প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় নয়। ব্যাংক, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি, ব্যবসায়িক নিবন্ধন বা অন্যান্য উৎসের তথ্য ভুল কিংবা অসম্পূর্ণ হলে করদাতার রিটার্নেও অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে। তাই রিটার্নে তথ্য দেওয়ার সময় প্রতিটি আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের হিসাবের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্যের সামঞ্জস্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

রিটার্ন অডিটে পড়লে যা করতে হবে?
রিটার্ন অডিটে পড়লে করদাতাকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, উপ-কর কমিশনারের কাছে কর নির্ধারণের জন্য করদাতার উপস্থিতি বা সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে শুনানির জন্য তাকে ডাকা হবে। করদাতা নিজে অথবা তার প্রতিনিধি শুনানিতে উপস্থিত হয়ে রিটার্নে দেখানো আয়-ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারবেন। শুনানির সুযোগ না দিয়ে বাড়তি কর আরোপ করা হবে না। বাড়তি কর আরোপ করা হলে তা ৩০ দিনের মধ্যে করদাতাকে জানাতে হবে।

ভুল রিটার্ন দাখিল করদাতার ঝুঁকি বেশি
ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন খান বলেন, অনেক করদাতা বাসায় বসে কিংবা কম্পিউটারের দোকানের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দেন। কিন্তু রিটার্ন প্রস্তুত করতে হিসাববিজ্ঞান ও আয়কর আইন সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে ভুল হিসাব বা ভুলভাবে তথ্য উপস্থাপনের কারণে করদাতা সমস্যায় পড়তে পারেন।

তিনি বলেন, রিস্ক-বেইজড অডিটের জন্য রাজস্ব বোর্ড নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করেছে। আয়ের তুলনায় কম কর দেওয়া, করের তুলনায় বেশি সম্পদ থাকা, ঋণ বা দান-হেবা থেকে সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন বিষয় এসব ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে রয়েছে। রিটার্নে সম্পদ ও দায়ের বিবরণ থাকে। ফলে হিসাববিজ্ঞান ও আয়কর আইন না বুঝে ভুলভাবে তথ্য উপস্থাপন করলে করদাতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *