সুগন্ধি সাবানের বাজারে বাড়ছে দেশীয় ব্র্যান্ডের দাপট
একসময় ফা, ইম্পেরিয়াল লেদার কিংবা ডাভের মতো বিদেশি ব্র্যান্ডের সুগন্ধি সাবান ছিল অভিজাত শ্রেণির পছন্দের প্রতীক। উন্নত মান, আকর্ষণীয় মোড়ক ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির কারণে এসব সাবান দ্রুতই ভোক্তাদের নজর কাড়ে। একপর্যায়ে শহরের অভিজাত দোকান ছাড়িয়ে মফস্বল এমনকি পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানেও জায়গা করে নেয় এসব বিদেশি ব্র্যান্ড।
তখন অনেকের ধারণা ছিল, বিদেশি কোম্পানিগুলোই হয়তো একসময় বাংলাদেশের সুগন্ধি সাবানের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে সেই চিত্র। বিদেশি ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেনি, বরং বাজার সম্প্রসারণেও এগিয়ে গেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সুগন্ধি সাবানের বাজারে দেশীয় কোম্পানিগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তার রুচি, ক্রয়ক্ষমতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন নতুন পণ্য বাজারে আনছে। একই সঙ্গে উন্নত মান, বৈচিত্র্যময় সুগন্ধ এবং সাশ্রয়ী দামের কারণে দেশীয় ব্র্যান্ডের প্রতি ভোক্তাদের আস্থাও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সুগন্ধি সাবানের বাজারের আকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার। এর বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদেশি কোম্পানির মধ্যে ইউনিলিভারের লাক্স ও লাইফবয় এখনো শক্ত অবস্থানে থাকলেও দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত বাজার সম্প্রসারণ করছে।
বর্তমানে দেশের সুগন্ধি সাবানের বাজারে উল্লেখযোগ্য দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার টয়লেট্রিজের মেরিল, কোহিনূর কেমিক্যালের তিব্বত ও স্যান্ডালিনা, এসিআইয়ের স্যাভলন, মৌসুমী ইন্ডাস্ট্রিজের কিউট, কেয়া কসমেটিকসের কেয়া, অ্যারোমেটিক কসমেটিকসের অ্যারোমেটিক, লিলি কসমেটিকসের লিলি সোপ, মার্কস অ্যান্ড অ্যালিসের ক্যামেলিয়া এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের লিভানা।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বড় ও মাঝারি মিলিয়ে কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠান সাবান উৎপাদন করছে। তবে বাজারের মূল প্রতিযোগিতা হচ্ছে প্রায় ১৫-২০টি প্রতিষ্ঠিত দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে। এছাড়া ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সাবান উৎপাদন করছে। সব মিলে দেশে প্রায় ৮০টি প্রতিষ্ঠান সাবান উৎপাদন করছে।
উদ্ভাবনে এগোচ্ছে দেশীয় ব্র্যান্ড
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে পণ্যের বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবন। স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং ড. জেসমিন জামান বলেন, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
তার ভাষ্য, মেরিল ভোক্তার চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পণ্য বাজারজাত করছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট, যেমন মিল্ক সোপ, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাবান এবং সিরাম সাবান বাজারে আনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেই পণ্যের মান ও বৈচিত্র্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‘মেরিল সাবানের বিক্রি প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে। বাংলাদেশের সাবানের বাজার এখনো সম্ভাবনাময় এবং মেরিল এ বাজারে শক্ত অবস্থানে রয়েছে’—ড. জেসমিন জামান।
বাড়ছে সাবানের বাজার
দেশের ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস (এফএমসিজি) খাতের অন্যতম বড় পণ্য হলো সুগন্ধি সাবান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের আয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং শহুরে সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
বিশেষ করে করোনার পর পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাবান ও হ্যান্ডওয়াশের বাজারে। বর্তমানে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বিভিন্ন ধরনের সাবান ও হ্যান্ডওয়াশের ব্যবহার বাড়ছে।
দেশের পুরোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম কোহিনূর কেমিক্যাল। প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় পণ্যের মধ্যে রয়েছে স্যান্ডালিনা, তিব্বত ও ব্যাকট্রল ব্র্যান্ডের সাবান।
জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালক বলেন, সাবান বিক্রি কোহিনূর কেমিক্যালের ব্যবসার অন্যতম শক্তিশালী খাত। গত কয়েক বছরে সাবান বিক্রির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
যা বলছেন বিক্রেতারা
সাবানের বাজারে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কেমন চাহিদা তা নিয়ে কথা হয় কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গেও। তাদেরই একজন রামপুরা এলাকার মুন্নী স্টোরের বিক্রেতা আবু হোসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে বিদেশি ব্র্যান্ডের সাবানের চাহিদা বেশি ছিল। বিশেষ করে ফা, ইম্পেরিয়াল লেদার ও ডাভ সাবানগুলো ক্রেতারা পছন্দ করতেন। এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোও ভালো মানের সাবান তৈরি করছে। মানে ভালো এবং দামও তুলনামূলক কম হওয়ায় ক্রেতারা দেশীয় ব্র্যান্ডের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
আরেক বিক্রেতা তার মন্তব্যে কিছুটা তুলনামূলক চিত্র জানিয়ে বলেন, ধরুন, আমার দোকানে দিনে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি সুগন্ধি সাবান বিক্রি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫টি দেশীয় ব্র্যান্ড এবং ২০ থেকে ২৫টি বিদেশি ব্র্যান্ডের সাবান। কারণ, এখন দেশি অনেক কোম্পানি, সাবানের ক্ষেত্রে প্রচুর বৈচিত্র্যও আছে তাদের পণ্যে।
সাবানের বাজারের সম্ভাবনা দেখে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, সেখানে বাজারে প্রবেশ করছে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোও।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্স পারসোনাল কেয়ার লিমিটেড লিভানা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সাবানের বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। অন্যদিকে, বসুন্ধরা গ্রুপও টয়লেট্রিজ ও পার্সোনাল কেয়ার খাতে বাড়িয়েছে বিনিয়োগ। এছাড়া রিমার্ক এইচবি লিমিটেড লিলি বিউটি সোপের মাধ্যমে প্রসাধনী বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে।
লিলি বিউটি সোপের চিফ বিজনেস অফিসার আবির আদনান বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় এখন ভোক্তারা মানসম্মত পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে সাবানসহ ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। লিলি ব্র্যান্ড গত দুই বছরের মধ্যে বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সাবানে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, ভোক্তাদের মধ্যে সাড়াও ফেলেছে।
