পৃথিবীর একটি মাত্র দেশ নিজেদের সব খাবার নিজেরাই উৎপাদন করে
গায়ানা! দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট এই দেশটির নাম হয়তো অনেকেই শোনোনি। তবে জানলে অবাক হবে, পৃথিবীর বুকে এটিই একমাত্র দেশ, যারা নিজেদের প্রয়োজনীয় সব খাবার নিজেরাই উৎপাদন করে!
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় ১৮৬টি দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। সেই গবেষণার ফলাফলেই দেখা যায়, ৭টি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর সব কটিতেই কেবল গায়ানা নিজস্ব উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
এই সাতটি প্রধান খাদ্য হলো ফলমূল, শাকসবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, ডাল-বাদাম-বীজ এবং শর্করা বা শ্বেতসারজাতীয় প্রধান খাদ্য (যেমন: চাল, আলু ইত্যাদি)।
এখন মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন কেবল গায়ানাই নিজেদের সব খাবার নিজেরা উৎপাদন করতে পারে? এর পেছনে কয়েকটি দারুণ কারণ রয়েছে। গায়ানা নিরক্ষরেখার খুব কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় সেখানে সারা বছরই বেশ উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। পাশাপাশি প্রচুর বৃষ্টিপাতও হয়। এখানকার মাটিও অত্যন্ত উর্বর। এমন চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে গায়ানায় খুব সহজেই নানা জাতের ফসল ফলানো যায়।
গায়ানার কৃষকেরা অনেক সময় একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসলের চাষ করেন। একে বলা হয় মিশ্র চাষ। যেমন নারকেলবাগানের ফাঁকে ফাঁকে হয়তো আনারস বা টমেটোর চাষ হচ্ছে। আবার ভুট্টার সঙ্গে একই জমিতে বোনা হচ্ছে সয়াবিন। এতে যেমন জমির উর্বরতা বাড়ে, তেমনি ফসলের উৎপাদনও বহুগুণ বেড়ে যায়।
দেশটি এমন এক বিশেষ কৃষিপদ্ধতি ব্যবহার করে, যেখানে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় থাকে। সেখানে পশুপালন ও ফসল চাষ একই সঙ্গে করা হয়, যার ফলে মাটি ক্ষয়ও কম হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার বা পুনরুৎপাদনশীল কৃষি। বাংলাদেশও গায়ানার এই পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের কৃষিক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
গায়ানার মোট জনসংখ্যা মাত্র ৮ লাখের কাছাকাছি! পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। ফলে দেশটির নিজেদের সীমিত খাদ্য উৎপাদন দিয়েই খুব সহজে পুরো জনসংখ্যার চাহিদা মিটিয়ে ফেলা যায়।
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ কেন নিজেদের সব খাবার উৎপাদন করতে পারে না
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই নিজেদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের খাবার নিজেরা উৎপাদন করতে পারে না। এর পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, পৃথিবীর সব দেশের জলবায়ু বা মাটি এক রকম নয়। কিছু দেশে যেমন হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কোথাও আবার প্রচণ্ড শুষ্ক বা রুক্ষ মরুভূমি। তাই চাইলেও সব দেশে সব ধরনের ফল, সবজি বা শস্যের উৎপাদন সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, অনেক দেশেরই আয়তনের তুলনায় চাষযোগ্য কৃষিজমি অনেক কম। তার ওপর নতুন নতুন শহর, শিল্পকারখানা ও বড় বড় অবকাঠামো গড়ে ওঠার কারণে আবাদি জমি দিন দিন আরও কমে যাচ্ছে। ফলে একটি দেশের পক্ষে নিজেদের সব খাদ্য নিজ দেশে উৎপাদন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, অনেক দেশের জনসংখ্যা এতই বেশি যে, তাদের মোট খাদ্য উৎপাদন দিয়ে সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর পেট ভরে না। তখন দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়েই অন্য দেশ থেকে খাবার আমদানি করতে হয়।
চতুর্থত, কিছু দেশ আবার বিশেষ কোনো ফসল উৎপাদনে বেশ দক্ষ হয়। তখন তারা সেই নির্দিষ্ট ফসলটি বেশি পরিমাণে উৎপাদন করে অন্য দেশে রপ্তানি করে এবং তার বদলে নিজেদের প্রয়োজনীয় অন্য খাবারগুলো বিদেশ থেকে কিনে আনে। কারণ, ওই খাবারগুলো নিজেদের দেশে উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ পড়বে, অন্য দেশ থেকে আমদানি করলে তার চেয়ে অনেক কম খরচে পাওয়া যায়। এটি মূলত আধুনিক বৈশ্বিক বাণিজ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
