নিম্নবিত্তের জন্য টিসিবির একই পণ্যের দুই দাম
প্রতি মাসে নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে স্মার্টকার্ডধারীদের পণ্য বিক্রি করে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। আবার বিশেষ উপলক্ষ যেমন রোজা বা ঈদে দেওয়া হয় বিশেষ ট্রাকসেল কার্যক্রম। তবে একই পণ্যের দাম ট্রাকসেলে বেশি নির্ধারণ করে বিক্রি করছে সংস্থাটি।
দুই পণ্য বিক্রি কার্যক্রমের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হলো- মাসিক বিক্রি কার্যক্রমে শুধু স্মার্ট কার্ডধারীরা পণ্য কিনতে পারেন। আর ট্রাকসেলে যে কোনো ভোক্তা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কিনতে পারেন। স্মার্টকার্ড লাগে না।
তবে বিগত এক বছর ধরে এ দুই কার্যক্রমের মধ্যে আরেক বড় পার্থক্য হচ্ছে পণ্যের দাম। একই পণ্য কার্ডধারীদের চেয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। এটা নিম্নবিত্তের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে রোজা উপলক্ষে ট্রাকসেলে বিক্রি কার্যক্রম শুরু করছে সংস্থাটি। সঙ্গে চলবে প্রতি মাসের কার্ডধারীদের বিক্রি কার্যক্রমও। যেখানে কার্ডধারীরা প্রতি লিটার তেল কিনবেন ১০০ টাকায়, সেখানে সাধারণ ক্রেতাদের এজন্য গুনতে হবে ১১৫ টাকা। একইভাবে সাধারণ ক্রেতাদের ১০ টাকা বেশি দিয়ে চিনি কিনতে হবে ৮০ টাকায় ও মসুর ডালের দামও পড়বে ১০ টাকা বেশি, ৭০ টাকা।
টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল (সয়াবিন বা কুঁড়ার তেল), দুই কেজি মসুর ডাল ও এক কেজি চিনি কিনতে পারবেন। এতে ট্রাক থেকে ওই তিনটি পণ্য কিনতে কার্ড নেই এমন একজন গ্রাহকের মোট ব্যয় হবে ৩৮০ টাকা। কিন্তু একই পণ্য, একই পরিমাণে একজন কার্ডধারী ভোক্তা নেবেন ৩৩০ টাকায়। অর্থাৎ তিন পণ্যের জন্য সাধারণ ক্রেতাকে ৫০ টাকা বেশি দিতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘গরিবের কাছে বাড়তি দাম নেওয়া তাদের জন্য যন্ত্রণার। বরং, এসব স্মার্টকার্ড যাদের দেওয়া হয়েছে, যাদের থেকে কম দাম নেওয়া হচ্ছে, তারাই ধনী। এসব কার্ড বিতরণে অনেক জালিয়াতি হয়েছে। বাড়িওয়ালাও কার্ড পেয়েছে, সেটা আমরা দেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘বরং যারা পণ্যের জন্য রাস্তায় ট্রাকের বড় লাইনে দাঁড়ায় তারাই প্রকৃত হতদরিদ্র। তারা লাইনে দাঁড়ায়, ওইদিন কাজেও যেতে পারে না। আর স্মার্টকার্ড সে জোগাড় করতে পারেনি বলেই রাস্তায় নেমেছে। সেখানে সাশ্রয়ের নামে তার গলা কাটা হচ্ছে। এটি আসলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।’
চেষ্টা করেও অনেকে যে স্মার্টকার্ড পায়নি তার প্রমাণ রামপুরা জামতলা এলাকার ময়না আক্তার। তিনি বলেন, ‘বহু চেষ্টা করেও কার্ড করতে পারিনি। যে কারণে একই সদাই আমরা বেশি দামে কিনি। এটা জুলুম। রোদে পুড়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে বেশি টাকা দিতে হয়, তাও সেই ট্রাক আসে কয়েকমাস পরপর।’
এ বিষয়ে টিসিবির মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. শাহাদত হোসেন বলেন, ‘মূলত তিনটি কারণ বিবেচনায় স্মার্টকার্ডের চেয়ে ট্রাকসেলে পণ্যের দাম বেশি। প্রথমত, টিসিবির বিক্রি কার্যক্রমে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়, সেটা কমানো। দ্বিতীয়ত, বাজারদরের সঙ্গে দামের সমন্বয় রাখা, যেন বাজারে পণ্যের দামে খুব বেশি প্রভাব না পড়ে। শেষ কারণ হলো, ট্রাকসেলে যেহেতু যে কেউ পণ্য নেয়, এতে পণ্যের যথাযথ গ্রহীতা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, যারা একেবারে নিম্ন আয়ের নয়, তারাও নেয়। অনেক পরিবারের একাধিক সদস্য নেয়, অনেকে দু-তিনবার পণ্য নেয়।’
শাহাদত হোসেন বলেন, ‘এসব কারণে ট্রাকসেলে কিছুটা দাম বেশি করা হয়েছে গত বছর থেকে। যেন সমন্বয় সহজ হয়। যদিও এর আগে দুই কার্যক্রমে পণ্যের দাম একই ছিল।’
