এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় শিল্প রূপান্তরের বড় সুযোগ
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আরও তিন বছর সময় পেয়েছে বাংলাদেশ। এই সময়কে নিছক অপেক্ষার সুযোগ হিসেবে দেখছেন না রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, শিল্পের রূপান্তর ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর এখনই সময়।
এ সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি খাত, বিদেশি দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যকর অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাই পারে বাংলাদেশের মসৃণ এবং টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে উরুগুয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশের উত্তরণ-পূর্ব প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সাধারণ পরিষদ।এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে বাংলাদেশের।
যা করতে হবে
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এই বর্ধিত সময়সীমার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা। এছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যে সৃষ্ট নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগানো, আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা এবং আরও শক্তিশালী করা।
মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, এই অতিরিক্ত সময়কে শিল্প রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অনুঘটক হিসেবে কাজে লাগানো, যাতে নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে।
‘বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এখন নীতিগত অঙ্গীকারের বাইরে গিয়ে কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দরের সেবার মান ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পরিবহন ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কোনো ধরনের বিলম্ব ছাড়াই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজ সম্পন্ন
এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আর বাড়ানোর আবেদন না করার বিষয়ে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছে। ফলে প্রয়োজনীয় সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার কিংবা সক্ষমতা উন্নয়নের কঠিন কিন্তু অপরিহার্য প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। বর্ধিত এই সময়কে এলডিসি-পরবর্তী বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতার জন্য দেশের শিল্প খাতকে প্রস্তুত করার কৌশলগত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।’করা এখন দেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত’, বলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
কৌশলপত্র তৈরি হয়েছে, চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত হয়েছে এবং কী কী করতে হবে, সে বিষয়েও আমাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে জানিয়ে হাসান বলেন, ‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন। আমাদের অঙ্গীকারগুলো পরিমাপযোগ্য অগ্রগতিতে রূপ দিতে হবে, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।’
‘একই সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, যাতে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের বাস্তব অগ্রগতি তুলে ধরা যায়,’ জানান হাসান।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন মূল চ্যালেঞ্জ আর কী করতে হবে তা নির্ধারণ করা নয়, বরং কার্যকর সমন্বয়, জবাবদিহি ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এলডিসি উত্তরণ কৌশলের বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাংলাদেশ বাস্তবে কতটা অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে, শুধু কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তার ওপর নয়।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এলডিসি উত্তরণকে সফল করতে প্রথমেই বিদ্যমান স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজিকে একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘কোন সংস্থা কী কাজ করবে, কত সময়ের মধ্যে করবে এবং অগ্রগতি কীভাবে পরিমাপ করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। প্রতিটি সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও পরিমাপযোগ্য সূচক থাকতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি, মূল্যায়ন এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পর বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ও পৃথক আচরণের আওতায় পাওয়া বিভিন্ন ছাড় হারাতে হবে বাংলাদেশকে। ফলে শুল্কনীতি ও ভর্তুকি কাঠামোয় পরিবর্তনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত এবং কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা হারানোর চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।’
এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে লজিস্টিকস, ব্যাংকিং খাত, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তার ভাষায়, ‘গত আট বছরে যেসব সংস্কার সম্পন্ন করা উচিত ছিল, সেগুলো আগামী ছয় বছরের মধ্যেই শেষ করতে হবে। তবে অতীতের সংস্কার বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সময়মতো এসব কাজ সম্পন্ন করা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না।’
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরাও এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা সংস্থাগুলোর বিদ্যমান সহায়তা এবং সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
যেভাবে যোগ্য হলো বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ফলে ২০১৮ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশটি। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারণ করে- মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা। ২০১৮ সালের প্রথম পর্যালোচনায় বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করে।
এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয় পর্যালোচনাতেও বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। ওই বছর মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার, মানবসম্পদ সূচকে স্কোর ছিল ৭৫ দশমিক ৪ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে স্কোর ছিল ২৭। পরপর দুটি পর্যালোচনায় তিনটি মানদণ্ড পূরণ করায় সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করে। একই বছর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এবং সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) সেই সুপারিশ অনুমোদন করে।
প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ায় উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
