আগাম রিটার্নে ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
আয়কর রিটার্ন দাখিল সহজ করা এবং করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দিতে উৎসাহিত করতে নতুন ব্যবস্থা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন সেবা ২২ জুলাই চালু করা হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো আগেভাগে রিটার্ন জমা দিলে নিট প্রদেয় করের ৫ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর পাশাপাশি অধিকাংশ ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এসব উদ্যোগে রিটার্ন দাখিলের শুরুতেই সাড়া মিলেছে। গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত এনবিআর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে ১২ লাখ ৫৩ হাজার ব্যক্তি করদাতা রিটার্ন দিয়েছেন। আগের করবর্ষের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৯ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে একই সময়ের রিটার্ন দাখিল বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ।
তবে, এই প্রবৃদ্ধি করের আওতা কতটা বাড়িয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ অনলাইনে রিটার্ন দেওয়ার সংখ্যা বাড়া মানেই নতুন করদাতা যুক্ত হওয়া নয়। আগের করদাতারাও এবার অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছেন।
অন্যদিকে, নিবন্ধিত টিআইএনধারীদের বড় অংশ নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছেন না। ফলে করসেবা সহজ করার পাশাপাশি নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের কর পরিপালনের আওতায় আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
আগাম রিটার্নে ৫ শতাংশ কর ছাড়
চলতি করবর্ষে আগেভাগে রিটার্ন দাখিলে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নিট প্রদেয় করের ৫ শতাংশ রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়। তবে, এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেয়াতের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিয়ে প্রায় তিন লাখ করদাতা এ সুবিধা নিয়েছেন। তবে সব করদাতা এ প্রণোদনার সুবিধা পাননি। যাদের কর উৎসে কেটে রাখা হয়েছে বা অগ্রিম কর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, উৎসে কর কর্তন ও অগ্রিম করের কারণে অনেক করদাতার কর আগেই পরিশোধ হয়ে যায়। ফলে আগেভাগে রিটার্ন দিলেও তারা বাড়তি সুবিধা পান না। তার মতে, এ ধরনের করদাতাদেরও উৎসাহিত করার মতো করে প্রণোদনা ব্যবস্থাটি সাজানো প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে এই প্রণোদনা পাওয়া যাবে না। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দিলে নিট প্রদেয় করের ২ শতাংশ বা সর্বনিম্ন তিন হাজার টাকা, যেটি বেশি অতিরিক্ত কর দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত করের পরিমাণ হবে নিট প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা, যেটি বেশি।
এভাবে আগেভাগে রিটার্ন জমা দেওয়ার আর্থিক সুবিধা এবং দেরিতে রিটার্ন দেওয়ার বাড়তি খরচ নির্ধারণ করে করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দিতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক
ই-রিটার্ন ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করতে এবার অধিকাংশ ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২২ জুলাই চালু হওয়া এ ব্যবস্থায় করদাতারা ঘরে বসে রিটার্ন পূরণ ও জমা দিতে পারেন। রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র, রিটার্নের কপি, আয়কর সনদ এবং কর পরিশোধের চালান ডাউনলোড করা যায়।
তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধিরা কাগজে রিটার্ন দিতে পারবেন। বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী, কাগজে রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে নিবন্ধন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়লে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে কাগজে রিটার্ন দেওয়া যায়।
এনবিআরের ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে কর পরিশোধ করা যায়। এতে করদাতাদের কর কার্যালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমে। রিটার্নে তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হলে জমা দেওয়ার পরই প্রয়োজনীয় সনদ ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব।
এনবিআর ২০২১ সালে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা চালু করে। এরপর ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে। গত করবর্ষে প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছিলেন, যা তখন পর্যন্ত ই-রিটার্নের রেকর্ড।
নিবন্ধিত টিআইএনধারীদের বড় অংশ রিটার্ন দেন না
রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বাড়লেও করের আওতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ২০২৫-২৬ করবর্ষে প্রায় ৪৯ লাখ ই-টিআইএনধারী রিটার্ন দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আনুমানিক ৩২ লাখ করদাতা কর পরিশোধ করেছিলেন।
অন্যদিকে, দেশে নিবন্ধিত ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। অর্থাৎ, নিবন্ধিত টিআইএনধারীর তুলনায় নিয়মিত রিটার্নদাতার সংখ্যা অনেক কম। তবে টিআইএনধারী হলেই প্রত্যেককে একইভাবে প্রতি বছর রিটার্ন দিতে হবে, এমন নয়। আইন অনুযায়ী, কার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
এই ব্যবধান কমাতে নতুন করদাতা শনাক্ত করা, যাদের রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাদের রিটার্ন নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের আয় ও সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রের বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে কার্যকর করা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থার তথ্যের সমন্বয় করের আওতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এ ধরনের উদ্যোগের ফলাফল বুঝতে নতুন করে কতজন করদাতা রিটার্ন দিচ্ছেন এবং কতজন নিয়মিত কর পরিশোধ করছেন, তার হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
অডিটে স্বয়ংক্রিয় নির্বাচন
রিটার্নের তথ্য যাচাই এবং কর ফাঁকি শনাক্ত করতে অডিট ব্যবস্থাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে এনবিআর। গত ২৮ এপ্রিল বোর্ড জানায়, ২০২৩-২৪ করবর্ষের ৭২ হাজার ৩৪১টি আয়কর রিটার্ন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন নির্বাচন করায় যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। তবে অডিটের জন্য কোনো রিটার্ন নির্বাচিত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট করদাতা কর ফাঁকি দিয়েছেন, এমন নয়। অডিটে আয়, ব্যয়, সম্পদ ও কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হয়।
এর পাশাপাশি অতীতে রিটার্ন না দেওয়া টিআইএনধারীদের চিঠি পাঠানোর উদ্যোগও নিয়েছিল এনবিআর। তবে চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে এ ধরনের নোটিশ দিয়ে কতজনকে রিটার্নের আওতায় আনা হয়েছে, তার হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
শুধু রিটার্ন নয়, বাড়াতে হবে করদাতার সংখ্যাও
চলতি করবর্ষের প্রথম তিন মাসে রিটার্ন দাখিল ৭৭ শতাংশ বাড়া এনবিআরের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি। আগাম রিটার্নে কর ছাড়, অনলাইনে রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা এবং ডিজিটাল কর পরিশোধের সুবিধা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে এ প্রবৃদ্ধির কতটা নতুন করদাতার কারণে এবং কতটা আগে থেকেই নিবন্ধিত করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দেওয়ার কারণে হয়েছে, তা জানতে আরো তথ্য প্রয়োজন।
এনবিআরের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ, রিটার্ন জমার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি করের আওতা সম্প্রসারণের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা। কতজন নতুন টিআইএন নিয়েছেন, তাদের মধ্যে কতজন রিটার্ন দিয়েছেন, কতজন কর পরিশোধ করেছেন এবং অডিটের মাধ্যমে কত অতিরিক্ত কর নির্ধারণ বা আদায় হয়েছে—এসব তথ্য দিয়ে কর ব্যবস্থার প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সম্ভব।
রিটার্ন দাখিল সহজ করা কর প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে, দীর্ঘ মেয়াদে করের আওতা বাড়াতে হলে করদাতাদের জন্য সহজ ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর পরিপালনের বাধ্যবাধকতা কার্যকর করতে হবে। তবেই ডিজিটাল রিটার্ন ব্যবস্থার সাফল্য রাজস্ব আহরণ ও করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হবে।
