মায়ের পেটেই শিশুর অস্ত্রোপচার! বিশ্ব যা পারেনি, চীন করে দেখাল

স্টাফ রিপোর্টার

এখনও মায়ের পেট থেকেই বের হয়নি। সেই শিশুরই অস্ত্রোপচার করে অসাধ্য সাধন করলেন চীনের চিকিৎসকরা। শিশুটির বুকে থাকা একটি দ্রুত বর্ধনশীল টিউমারে সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন তারা।

শেনজেন এবং হংকংয়ের একটি চিকিৎসক দল সম্প্রতি গর্ভে থাকা অবস্থাতেই ওই শিশুর বুকের টিউমার অপসারণের একটি অত্যন্ত কঠিন ও নিখুঁত অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে। এতে করে ভবিষ্যতে এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া রোগীদের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে।

এই অস্ত্রোপচারে অংশ নেন শেনজেনের বাওয়ান ওমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হসপিটাল ও চাইনিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের চিকিৎসকরা। এই অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পিআর রিভিউড জার্নাল ‘আলট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনিকোলজি’তে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়।

অস্ত্রোপচারের টেবিলে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী এক নারী। তিনি ২২ সপ্তাহের গর্ভবতী ছিলেন। গর্ভে থাকা ওই শিশুর মাইক্রোসিস্টিক কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফর্মেশন (সিপিএএম) ধরা পড়ে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুর ফুসফুসের স্বাভাবিক টিস্যুর পরিবর্তে অসংখ্য ছোট ছোট (সাধারণত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট) সিস্ট বা তরলপূর্ণ থলি তৈরি হয়।

এই বিরল জন্মগত অবস্থা ভ্রূণীয় বিকাশের সময় ফুসফুসের টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ঘটে থাকে। প্রাথমিকভাবে নিরীহ মনে হলেও, এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল ফুসফুসের টিউমার যা হার্ট ফেইলিওর এবং হাইড্রপস (প্রচুর পরিমাণে তরল জমা হওয়া)-এর কারণ হতে পারে।

স্ক্যান করে দেখা যায়, শিশুটির বুকের ডান দিকের পুরো গহ্বর জুড়ে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি) মাপের একটি পুরু টিউমার রয়েছে। এটি তার হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং এর ফলে শিশুটির পেটে বিপজ্জনক মাত্রায় তরল জমে ‘অ্যাসাইটিস’ হয়েছিল।

প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিতে সাধারণত জমে থাকা বড় আকারের তরলপূর্ণ থলিগুলো খালি করা হয় অথবা টিউমারের প্রধান রক্ত ​​সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু, যেহেতু এই নির্দিষ্ট টিউমারটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিস্ট বা তরলপূর্ণ থলি দিয়ে গঠিত ছিল এবং এর কেন্দ্রে কোনো রক্তনালী ছিল না, তাই প্রচলিত পদ্ধতিগুলোয় আগানো এক্ষেত্রে অকার্যকর প্রমাণিত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে শিশুটিকে বাঁচাতে ওই চিকিৎসক দল অভিনব এক পদ্ধতি অবলম্বন করে।

হাই-ডেফিনিশন, রিয়েল-টাইম আল্ট্রাসাউন্ড ইমেজিংয়ের সাহায্যে দলটি প্রথমে অস্ত্রোপচারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোর একটি পথ নির্ধারণ করে।

তারা মায়ের পেট, জরায়ুর দেয়াল এবং ভ্রূণের বুকের দেয়াল ভেদ করে মসৃণভাবে একটি সূক্ষ্ম অ্যাবলেশন নিডল (একটি বিশেষ ধরনের চিকন এবং উন্নতমানের মেডিকেল সূঁচ) প্রবেশ করিয়ে সরাসরি টিউমারের কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে দেয়।

মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি টিউমারে জমে থাকা পানির অণুগুলোকে কম্পিত করে তীব্র তাপ উৎপন্ন করে, যা ভেতর থেকেই টিউমারের টিস্যুকে ধ্বংস করে দেয়। এই সক্রিয় প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত ছিল। এতে মাত্র দুই মিনিট সময় লাগে।

পুরো প্রক্রিয়ানর সময় চিকিৎসকরা তাদের মনিটরে ভেতরে ছড়িয়ে পড়া তাপের ব্যাপ্তি পর্যবেক্ষণ করছিলেন যেন অনাগত শিশুটির দেহের কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

এই প্রক্রিয়ায় ফলও হয় খুব দ্রুত। তিনদিন পরই দেখা যায় টিউমারটির আকৃতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে এবং নতুন করে আর পানি জমছিল না।

পরে ৩৭ সপ্তাহের সফল গর্ভধারণের পর সন্তান জন্ম দেন ওই নারী। জন্মের সময় শিশুটির ওজন ছিল ২ দশমিক ৯ কেজি। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা মাপার মানদণ্ড অ্যাপগার স্কেলে শিশুটি ১০ এ ১০ই পেয়েছিল।

এরপর চার মাস পেরিয়ে গেলেও শিশুটির শরীরে টিউমার বাড়ার আর কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *