লাগামহীন এলপিজির বাজার
পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি থাকায় ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) ব্যবহার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও সরবরাহ কমার পাশাপাশি বেড়েছে এলপিজির আমদানি ব্যয়। ফলে বাংলাদেশে বোতলজাত এলপিজির বাজারে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বাজারের তথ্য বলছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খুচরা পর্যায়ে ৩শ টাকা থেকে ৫শ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির বোতলজাত এলপিজি। এই দামেও সব দোকানে মিলছে না সিলিন্ডার।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বৈশ্বিক সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এলপিজির বৈশ্বিক বাজারমূল্যের পাশাপাশি হু হু করে বাড়ছে জাহাজ ভাড়াও। ফলে এলপিজি সংগ্রহে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না বেসরকারি উদ্যোক্তারা। এতে দেশের বাজারে তৈরি হচ্ছে সংকট।
বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি বলছে, আগের বছরের চেয়ে সরবরাহ ২০-২৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ার প্রভাব পড়েছে এলপিজিতে। এতে এলপিজির বাজার ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করছে।
জানা যায়, আমাদের দেশে গৃহস্থালি বাদেও শিল্প-কারখানা ও যানবাহনে ন্যাচারাল (প্রাকৃতিক) ও পেট্রোলিয়াম দুই ধরনের গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি (লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, চা-বাগান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং গৃহস্থালিতে সরবরাহ করা হয়। পুরো কর্মযজ্ঞটি সম্পাদন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। স্বাভাবিক সময়ে দেশি উৎস ও আমদানির মাধ্যমে পেট্রোবাংলা সরবরাহ দেয় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। বর্তমানে কমবেশি ২৬শ ঘনফুট সরবরাহ দেওয়ায় সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও চলছে গ্যাসের জন্য হাহাকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা নিয়ন্ত্রণাধীন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করার সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে ১১শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে।
এর মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ- ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) থেকে নিয়মিতভাবে সাড়ে ৯শ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বেকায়দায় পড়তে হয় বাংলাদেশকে। আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ দাম দিয়ে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে।
একদিকে গৃহস্থালিতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় ২০১৫ সালের পর থেকে হোটেল, রেস্তোঁরা ও বাসাবাড়িতে সিলিন্ডারে এলপিজি ব্যবহার হয়ে আসছে। পাশাপাশি যেসব ভোক্তা পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করে আসছেন, নিয়মিত গ্যাস না পেয়ে তারাও বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে হঠাৎ করে ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এলপিজি ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি করেছে। চাহিদার বাড়তি চাপ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো সৌদি আরামকো ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এই সৌদি সিপির ওপর ভিত্তি করে দেশের বাজারে এলপিজির ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য সমন্বয় করে।
সৌদি আরামকোর ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে প্রোপেন ছিল প্রতি টন ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৬৬০ ডলার। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি টনে দাম বেড়েছে। আগস্ট মাসে সৌদি সিপি ছিল প্রোপেন ৬২০ ডলার এবং বিউটেন ৬৪০ ডলার। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি উদ্যোক্তারা এলপিজিতে ৩৫ শতাংশ প্রোপেন এবং ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ করে।
১০ সেপ্টেম্বর বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। আগের মাসে ছিল ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। এতে এ মাসে প্রতি সিলিন্ডারে ১৩ টাকা কমানো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজিএল থেকে সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ৭৭৭ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কথা হলে দেশে এলপিজির বড় উদ্যোক্তা বিএম এনার্জির অভিভাবক প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্বে এলপিজি নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে এলপিজির সরবরাহ কমেছে। বিশ্বের বড় বড় দেশ বেশি দামে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এতে আমরা প্রতিযোগিতা করে এলপিজি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। তারপরেও অক্টোবর মাসের জন্য আমরা কিছু এলপিজি সংগ্রহ করেছি। তাতে ওই মাসে আমাদের অনেক টাকা লোকসান দিতে হতে পারে।’
কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বিইআরসি খুচরায় এলপিজির যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, তাতে প্রতি টনের ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) ধরা হয়েছে ১৬০ ডলার। আগের মাসের ফ্রেইটের ওপর ভিত্তি করে চলতি মাসের এলপিজির খুচরা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে বিইআরসি। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্রেইট প্রতি টনে ৪শ ডলার পৌঁছেছে। এতে বেশি টাকা খরচ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা লোকসান দেবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার তো বেশি দামে এলপিজি কিনে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে গ্যাস দিচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা তো ভর্তুকি দিতে পারবে না। তাছাড়া মাসের শেষ হওয়ায় কারও কাছে এলপিজি মজুত নেই। আমাদের মজুতও সোমবার শেষ হয়ে যাবে।’
এদিকে খুচরা বাজারে হু হু করে বাড়ছে বোতলজাত এলপিজির দাম। অনেক জায়গায় টাকা দিয়েও মিলছে না এলপিজি। রোববার চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে বাজারে এলপিজির সরবরাহে সংকটের আঁচ পাওয়া যায়।
নগরীর বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড এলাকার এলপিজি বিক্রেতা আল বারাকা স্টোরের মো. ফরিদ বলেন, ‘আমাদের অনেক সিলিন্ডার খালি। ডিলাররা গ্যাস দিচ্ছে না। গত তিনদিন ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ২-৩শ টাকা দাম বেড়েছে।’
ফরিদ বলেন, ‘বর্তমানে জেএমআই ১৮শ ৫০ টাকা, ফ্রেশ ও যমুনা ১৮শ ৩০ টাকা, টোটাল ১৯শ টাকা এবং প্লাস্টিক (বেক্সিমকো) বিক্রি হচ্ছে ২১শ টাকায়। বাজারে বেক্সিমকোর সিলিন্ডারগুলোকে ‘প্লাস্টিক’ নামেই চেনে।
একইদিন বিক্রি নগরীর চান্দগাঁওয়ের খতিবের হাট এলাকার খাজা ইলেক্ট্রিক দোকানি জানান, ‘বাজারে এলপিজির সরবরাহ অনেক কম। বেক্সিমকো ২১শ টাকা, বিএম ১৮শ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
লালখান বাজার চাঁনমারি এলাকার বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার রিজেন্সি গ্যাস হাউজের মো. মহসিন বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। বটলার থেকে সাপ্লাই নেই। গ্যাস না থাকায় আমরা দোকান বন্ধ করে রেখেছি।’
এ বিষয়ে কথা হলে বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘চলতি মাসে বেসরকারি প্রডিউসাররা ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ দিয়েছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে একই সময়ে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ দিয়েছিল। তারপরেও পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত থাকার কারণে বাজারে এলপিজির চাহিদা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা প্রডিউসারদের সঙ্গে বৈঠক করেছি।’
বাংলাদেশে এলপিজি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘শুধু এলপিজি না, পুরো পেট্রোলিয়াম সেক্টরে সংকট চলছে। সরকার বেশি দামে এলএনজি কিনে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে সরবরাহ দিচ্ছে। সেখানে এলপিজিতে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয় না। তারপরেও বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্যোগে এলপিজি এনে বাজার সচল রেখেছে।’
খুচরা বাজারে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের আমদানিকারক, প্ল্যান্ট মালিকদের পর্যায়ে কেউ বেশি দাম নিচ্ছে না। আমাদের কোনো ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর বেশি দামে বিক্রি করছে না। আমাদের তালিকাভুক্ত কোনো ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর বেশি দাম নেওয়ার প্রমাণ পেলে আমরা তাদের ডিলারশিপ বাতিল করে দেবো। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে বিক্রি করলে সেই দায় তো আমরা নিতে পারবো না। খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণের দায় সরকারের। সরকারি এজেন্সিগুলো, লোকাল প্রশাসন এগুলো চাইলে দুদিনের মধ্যে বন্ধ করতে পারে।’
