জ্বালানি বিক্রি কমেছে বিপিসির, বেড়েছে পদ্মা অয়েলের
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি বিক্রি কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু সদ্য বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি বিক্রি আবার কমেছে। গত অর্থবছরে ২ লাখ ৬০ হাজার ৭২৮ টন জ্বালানি কম বিক্রি হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ছয়টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি বিক্রি করে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার ৬১৩ টনে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় ডিজেল, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিনের বিক্রি কমলেও বেড়েছে অকটেন ও জেট এ-১ বিক্রি। পণ্য বিক্রিতে শীর্ষে রয়েছে পদ্মা অয়েল পিএলসি। বিপিসি ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, জ্বালানি বিক্রিতে প্রতিযোগিতামূলক অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক শীর্ষে রয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিএলসি। বিপিসির মোট জ্বালানি পণ্য বিক্রির ৪০ শতাংশের বেশি বিক্রি করেছে পদ্মা। বিগত অর্থবছরে পদ্মা অয়েল ২৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯০৫ টন পণ্য বিক্রি করেছে। এতে আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৩৯ হাজার টন বেশি জ্বালানি বিক্রি করেছে পদ্মা অয়েল।
এ বিষয়ে কথা হলে পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানের সবস্তরের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে বিগত অর্থবছরে পদ্মা অয়েলের পণ্য বিক্রি বেড়েছে। বিক্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিগত অন্য বছরগুলোর তুলনায় গত অর্থবছরে অপারেশনাল ক্ষতিও কমে আসছে। এতে পদ্মা অয়েলের সামগ্রিক অগ্রগতিতে আর্থিকভাবেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, পদ্মা অয়েল কোম্পানির লোকবল অনেক বেশি। নেটওয়ার্কও অনেক বড়। বিপণন নেটওয়ার্ক ও লোকবল পর্যালোচনা করলে পদ্মা অয়েল আরও বেশি জ্বালানি বিক্রি ও অপারেশনের সক্ষমতা রাখে বলে দাবি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট জ্বালানির মধ্যে বিপিসির ডিজেল বিক্রি আগের বছরের তুলনায় কমলেও কাকতালীয়ভাবে যমুনা অয়েলের ডিজেল বিক্রি বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ১৩ হাজার ২০২ টন ডিজেল বেশি বিক্রি করেছে যমুনা অয়েল। তবে ডিজেল বিক্রিতে শীর্ষে রয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। প্রতিষ্ঠানটি সদ্য বিগত অর্থবছরে ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৬ টন ডিজেল বিক্রি করেছে।
তথ্য মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছিল ৬৭ লাখ ৬১ হাজার ৩২০ টন জ্বালানি। তবে বিপিসির ইতিহাসে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৭৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫ টন জ্বালানি বিক্রি হয়। ওই বছরেও পণ্য বিক্রিতে শীর্ষে ছিল পদ্মা অয়েল।
সূত্রে জানা গেছে, বিপিসির ছয় অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল কোম্পানি, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি (এসএওসিএল), এলপিজিএল ও ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স পিএলসি (ইএলবিএল) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার ৬১৩ টন পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বিক্রি করে। এরমধ্যে ৪৩ লাখ ২ হাজার ৯২৭ টন ডিজেল, ৬ লাখ ২৪ হাজার ফার্নেস অয়েল, ৬ লাখ ১০ হাজার ৮৬৩ টন জেট এ-ওয়ান, ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫১ টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ টন অকটেন, ৪২ হাজার ৭৪৭ টন কেরোসিন, ৪৫ হাজার ৫৮৭ টন বিটুমিন, ১৪ হাজার ৯৪০ টন এলপিজি, ১৪ হাজার ৭২৭ টন লুব অয়েল, ২ হাজার ৯৫০ টন মেরিন ফুয়েল, ৮ হাজার ৫৮৭ টন জুট বেসিং অয়েল (জেবিও) এবং ৩ হাজার ৪৩ টন অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পদ্মা অয়েল ২৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯০৫ টন জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করে। বিপিসির মোট বিক্রির ৪০ দশমিক ৫৩ শতাংশ জ্বালানি বিক্রি করে ছয় বিপণন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিক্রিতে শীর্ষে রয়েছে পদ্মা অয়েল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৩৮৭ টন জ্বালানি বেশি বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৫১৮ টন জ্বালানি বিক্রি করে পদ্মা অয়েল।
৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ জ্বালানি বিক্রি করে পরের অবস্থানে রয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তারা ২১ লাখ ৯০ হাজার ৫৭৫ টন পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বিক্রি করে। আগের বছর ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪ টন পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বিক্রি করে। বছরের ব্যবধানে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিক্রি কমেছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪২৯ টন জ্বালানি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে যমুনা অয়েল কোম্পানি ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ১২৭ টন জ্বালানি বিক্রি করে, যা মোট বিক্রির ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় ৮০ হাজার ৮৯৮ টন জ্বালানি কম বিক্রি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যমুনা অয়েল কোম্পানি ১৭ লাখ ১৬ হাজার ২৫ টন জ্বালানি বিক্রি করে।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল) ৮০ হাজার ৫০৬ টন, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স পিএলসি (ইএলবিএল) প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন এবং এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) মাত্র ৯২ টন জ্বালানি বিক্রি করে। মূলত এসএওসিএল এবং ইএলবিএল প্রতিষ্ঠান দুটি ব্লেন্ডিং প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে ব্লেন্ডিং কাজের বাইরে এসএওসিএল ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিন ও এলপিজিও বিপণন করে। অন্যদিকে ইএলবিএল গত অর্থবছরে শুধু বিটুমিন বিপণন করেছে।
তাছাড়া এলপিজিএলের বোতলজাতকৃত এলপি গ্যাস পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসএওসিএল বিপণণ করে। পাশাপাশি তারা সরাসরি টেন্ডারের মাধ্যমে বাল্কে কিছু এলপিজি বিক্রি করে থাকে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এসএওসিএল ১ লাখ ২৬৫ টন, এলপিজিএল ২ হাজার ৬৫২ টন এবং ইএলবিএল ৬ হাজার ৮৭৭ টন জ্বালানি বিক্রি করে।
জ্বালানি বিক্রি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (বিপণন)-এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পরিচালক (পরিকল্পনা) আসাদুল হক বলেন, ‘আমি বিপণনের অতিরিক্ত দায়িত্বে আছি। গত অর্থবছরে জ্বালানি বিক্রি কমে যাওয়া নিয়ে কোনো চিত্র আমার জানার সুযোগ হয়নি।’
‘মূলত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নির্ভর ডুয়েলফুয়েল সক্ষমতার কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস ব্যবহার করে। সরকারি অনুমোদন নিয়ে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেরাই ফার্নেস অয়েল আমদানি করে ব্যবহার করেছে। ওই হিসাবটি বিপিসির হিসেবে আসেনি। যে কারণে আগের বছরের তুলনায় জ্বালানি বিক্রি কমেছে বলে মনে হচ্ছে।’
