বন্দর মাশুল বাড়ায়

দাম বাড়বে খাদ্যপণ্যের

স্টাফ রিপোর্টার

চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৬ সেবায় গড়ে মাশুল বেড়েছে ৪১ শতাংশ। বেড়েছে বাল্কপণ্য আমদানির মাশুলও। আমদানি করা ভোগ্যপণ্য আমদানি হয় বাল্ক জাহাজে। বন্দর মাশুল বাড়ায় দাম বাড়বে খাদ্যপণ্যের। প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরের মাশুল বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে। গম, ভোজ্যতেল, চিনি থেকে শুরু করে আমদানি করা ফলের দাম বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও পাইকারি আড়তদার ব্যবসায়ীরা।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্ধিত মাশুলে আমদানি করা প্রতি কেজি বাল্কপণ্যে পরিবহন ব্যয় পড়ছে ৪৪ পয়সা। আগে যেখানে ছিল ৩২ পয়সা। এতে বাল্কপণ্যে প্রতি কেজিতে ব্যয় বেড়েছে ১২ পয়সা। এতে ভোক্তাপর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

বন্দরের নতুন মাশুল আরোপ করে রোববার গেজেট প্রকাশ করা হয়। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান সই করা এক প্রজ্ঞাপনে এ গেজেট প্রকাশিত হয়। ঘোষিত গেজেট অনুযায়ী সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন মাশুল কার্যকর হয়েছে।

কীসে কত মাশুল
ঘোষিত গেজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, পণ্যভর্তি প্রতি টিইইউস (২০ ফুট একক) কনটেইনারে বর্তমানে গড়ে মাশুল দিতে হবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা, যা আগে গড়ে ছিল কনটেইনারপ্রতি ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। নতুন ট্যারিফ রেট অনুযায়ী, কনটেইনার ওঠানো-নামানোতে চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮ ডলার, যা আগে ছিল ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার।

পাশাপাশি জাহাজের পাইলটিং চার্জ বিদ্যমান মাশুলে ৩৫৭ ডলার হলেও নতুন মাশুলে রাখা হয়েছে ৮শ ডলার। প্রতি টিইইউ (২০ ফুট) কনটেইনারের জন্য গ্যান্ট্রি ক্রেন চার্জ ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৮০ ডলার, যা আগে ছিল ১৫ ডলার।

কনভেনশনাল কার্গোর রিভার ডিউজ চার্জ আমদানি কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি টনে শূন্য দশমিক ৪৪৩ ডলার, ডমেস্টিক কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি টনে শূন্য দশমিক ১২৮ ডলার মাশুল নির্ধারণ করা হয়। কনভেনশনাল কার্গোর ওয়্যারফেজ চার্জ (ল্যান্ডিং/শিপিং) ব্যাগড কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি টনে শূন্য দশমিক ৯৬৪ ডলার, সব ধরনের বাল্ক কার্গোর ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১ দশমিক ৫৩২ ডলার, ব্রেক বাল্ক এবং অন্য কার্গোর ক্ষেত্রে তিন টনের নিচে টনপ্রতি ১ দশমিক ৩৯৩ ডলার, তিন থেকে ২০ টনে টনপ্রতি ২ দশমিক ৬১০ ডলার এবং ২০ টনের ওপরে টনপ্রতি ৩ দশমিক ৬২৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি আমদানি কার্গোতে গম ও চালের ক্ষেত্রে ব্যাকড কার্গোর ঘোষিত চার্জের সঙ্গে ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত এবং শাটআউট কার্গোর ক্ষেত্রে টনপ্রতি শূন্য দশমিক ৯৮২ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।

কনভেনশনাল কার্গোর এক্সট্রা হ্যান্ডলিং চার্জ (হোস্টিং) আমদানি কার্গোতে ব্যাগড কার্গোর ক্ষেত্রে প্রতি টনে শূন্য দশমিক ৯৬৪ ডলার, সব ধরনের বাল্ক কার্গোর ক্ষেত্রে টনপ্রতি ১ দশমিক ৫৩২ ডলার, ব্রেক বাল্ক এবং অন্য কার্গোর ক্ষেত্রে তিন টনের নিচে টনপ্রতি ১ দশমিক ৩৯৩ ডলার, তিন থেকে ২০ টনে টনপ্রতি ২ দশমিক ৬১০ এবং ২০ টনের ওপরে টনপ্রতি ৩ দশমিক ৬২৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

কনভেনশনাল কার্গোর স্টোরেজ চার্জ (ওয়ার্প রেন্ট) আমদানি কার্গোতে কমন ল্যান্ডিংয়ের দিন থেকে লোড ট্রান্সপোর্ট ডেলিভারি পর্যন্ত চারদিন ফ্রি, ট্রান্সশিপমেন্ট/রি-শিপমেন্ট কার্গোর ক্ষেত্রে ইমপোর্টিং ভ্যাসেল থেকে কমন ল্যান্ডিং করা থেকে এক্সপোর্টিং ভ্যাসেলের লোডিং পর্যন্ত ১০ দিন ফ্রি, রপ্তানি কার্গোর ক্ষেত্রে বন্দরে কার্গো গ্রহণ থেকে নির্ধারিত জাহাজে জাহাজীকরণ পর্যন্ত ছয়দিন ফ্রি টাইম রাখা হয়েছে।

এরপর ব্যাগড কার্গোতে ফ্রি টাইমের পরের সাতদিন পর্যন্ত প্রতি টনে দৈনিক শূন্য দশমিক ১৮২ ডলার, অষ্টম দিন থেকে ২০তম দিন পর্যন্ত টনপ্রতি দৈনিক শূন্য দশমিক ৫৪৬ ডলার এবং ২১তম দিন থেকে টনপ্রতি দৈনিক শূন্য দশমিক ৭২৮ ডলার ওয়ার্প রেন্ট নির্ধারণ করা হয়।

পাশাপাশি বাল্ক কার্গোতে ফ্রি টাইমের পরের সাতদিন পর্যন্ত প্রতি টনে দৈনিক শূন্য দশমিক ৩১০ ডলার, অষ্টম দিন থেকে ২০তম দিন পর্যন্ত টনপ্রতি দৈনিক শূন্য দশমিক ৯৩০ ডলার এবং ২১তম দিন থেকে টনপ্রতি দৈনিক ১ দশমিক ২৪০ ডলার ওয়ার্প রেন্ট নির্ধারণ করা হয়।

অন্য কার্গোর ক্ষেত্রে ফ্রি টাইমের পরের সাতদিন পর্যন্ত প্রতি টনে দৈনিক শূন্য দশমিক ৬১৯ ডলার, অষ্টম দিন থেকে ২০তম দিন পর্যন্ত টনপ্রতি দৈনিক ১ দশমিক ৮৫৭ ডলার এবং ২১তম দিন থেকে টনপ্রতি দৈনিক ২ দশমিক ৪৭৬ ডলার ওয়ার্প রেন্ট নির্ধারণ করা হয়।

যা বলছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা
বন্দর মাশুল বাড়ায় ভোগ্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ভোগ্যপণ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। খাতুনগঞ্জে আমদানি করা গমের বড় ব্যবসায়ী মুনাল ট্রেডিংয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার সুমন বাবু বলেন, ‘আমাদের দেশের বেকারিসহ খাদ্যপণ্য তৈরিতে গমের ব্যবহার হয়। চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। এখন আমদানি করা বাল্কপণ্যের মাশুল বাড়ার কারণে গমের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যে।’

এলপিজি, শিপিং, সিমেন্ট, শিপইয়ার্ড, অ্যাগ্রো শিল্পে বিনিয়োগ রয়েছে সিকম গ্রুপের। চলতি বছর থেকে ভোজ্যতেল আমদানি শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কথা হলে সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘গণমাধ্যমের খবরে ৩৯ বছর পর বন্দর মাশুল বাড়ানো হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। এটি সঠিক তথ্য নয়। বন্দরের মাশুল নির্ধারিত হয় ডলারে। ১৯৮৬ সালে যখন বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল নির্ধারণ করে তখন আমাদের টাকার বিপরীতে ডলারের দাম ছিল ৩০-৩১ টাকা। ৩৯ বছর পর এখন ডলারের দাম ১২২ টাকা হিসাব করলেও বন্দরের বিদ্যমান মাশুল ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চারগুণ হয়েছে। এখন তার ওপর নতুন করে মাশুল বাড়ানো হলো।’

সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘বন্দর তো কখনো লোকসানে ছিল না। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে বিগত ১৫ বছরে যত দুর্নীতি হয়েছে, সরকার তা ফরেনসিক তদন্ত করলে আরও হাজার হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে আসবে। এখন যে মাশুল বাড়িয়েছে, তাতে রপ্তানি খাতসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাশুল বাড়ানোর কারণে আমদানি খরচ বাড়ছে। এতে আমদানিনির্ভর সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে।’

বাংলাদেশে গমের বড় আমদানিকারক নাবিল গ্রুপ। চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকারি বাজারের মাধ্যমে তারা সারাদেশে গম সরবরাহ করে। কথা হলে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে কনটেইনারবাহিত পণ্যে। যেহেতু বন্দরের সবগুলো সেবায় মাশুল বাড়িয়েছে। সেক্ষেত্রে বাল্কপণ্য আমদানিতে যে ব্যয় বাড়বে, তা শেষে ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়বে। এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। পণ্যের আমদানি খরচ বাড়লে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামে প্রভাব ফেলবে।’

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন বলেন, ‘বন্দরের উচিত এত বেশি মাশুল বাড়ানো থেকে বিরত থাকা। ট্যারিফ বেশি হওয়ায় কনটেইনার ও জাহাজ ভাড়া বাড়ছে। এতে আমদানি খরচ বাড়বে। ফলে পরিবাহিত পণ্যের দামও বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, তাতে আমরা বলেছিলাম মাশুল একেবারেই যদি বাড়াতে হয় তাহলে ১০-১৫ শতাংশের বেশি যাতে বাড়ানো না হয়। আমরা গেজেট পেয়েছি, তাতে দেখেছি, সব ধরনের সেবায় গড়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশিও বাড়ানো হয়েছে। যতই বাড়ানো হোক, পণ্য আমদানির বর্ধিত ব্যয় ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করবে। শেষমেশ বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়বে।’

আমদানি করা রসুন, আদা, ফল ও মাছ-মাংস আসে রেফার কনটেইনারে। নতুন ট্যারিফে রেফার কনটেইনারের ক্ষেত্রেও মাশুল বেড়েছে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, ‘এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে ফলের দাম বাড়তি। বন্দরে নতুন করে শুল্ক বাড়ানোর কারণে আমদানি করা ফলসহ রেফার কনটেইনারে আমদানি করা সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে।’

বন্দরের মাশুল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শিপিং এজেন্টগুলোও বর্ধিত চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে রেফার কনটেইনারের ইলেক্ট্রিক মনিটরিং চার্জ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে শিপিং এজেন্টগুলো। গতকালই (সোমবার) গোল্ড স্টার শিপিং লাইন, এভারগ্রিন শিপিং প্রতি রেফার কনটেইনারে দৈনিক ৪০ ডলার করে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পোর্ট চার্জ আগে ৪০ কনটেনারের ক্ষেত্রে ফ্রি টাইমের পরে ১২ ডলার ছিল, এখন ৪৮ ডলার করা হয়েছে।’

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর কারণে আমাদের আমদানি-রপ্তানি উভয় খরচ বেড়ে যাবে। এমনিতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে ফ্রেইট চার্জ অত্যধিক। তার ওপর বন্দরের হ্যান্ডলিং চার্জ বেড়ে গেলে কাঁচামালের দাম বাড়বে। এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে রপ্তানি বাজারে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বো। পাশাপাশি ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে।’

তবে বন্দর মাশুল বাড়ানোর প্রভাব ভোক্তাপর্যায়ে পড়বে না বলে মনে করেন বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘আমরা বর্ধিত নতুন মাশুল পর্যালোচনা করে দেখেছি, আমাদের বাল্কপণ্যে বিদ্যমান রেটে প্রতি কেজিতে ৩২ পয়সা খরচ পড়ছে। বর্ধিত ট্যারিফ রেট অনুযায়ী তা কেজিপ্রতি ৪৪ পয়সা খরচ হবে। প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা খরচ বাড়বে। এতে আমাদের মনে হয় ভোক্তাদের এই ১২ পয়সা বেশি দেওয়া কোনো বিষয় নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *