অর্থনীতির গতি ফেরাতে যা করছে চীন
২০২১ সালের পর প্রথমবার মূল্য সংকোচন (ডিফ্লেশন) দেখল চীন। গত সপ্তাহে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটি। সর্বশেষ সূচক বলছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি মন্দা ভাবের দিকে যাচ্ছে। মন্দা পরিস্থিতি ঠেকাতে বেইজিং কীভাবে কাজ করছে সে বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাপান টুডে।
এক যুগ আগে যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট চলছিল, ওই সময়ে চীন ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের (বর্তমান মূল্যে ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার) এক বিশাল উদ্দীপনামূলক পরিকল্পনা ঘোষণা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর ও উচ্চগতির ট্রেন লাইনসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। অন্যদিকে, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও ক্রমবর্ধমান ঋণের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল।
ম্যাককোয়ারির অর্থনীতিবিদ ল্যারি হুর মতে, বর্তমানে চীন তার অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। তাই বেইজিং এখন ব্যাপক ও ব্যয়বহুল উদ্দীপনা পরিকল্পনার চেয়ে টার্গেটেড বা নির্ধারিত ব্যবস্থা নিতেই বেশি আগ্রহী। জুলাইয়ে সরকার বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ও গৃহস্থালি জিনিসপত্র কেনায় উৎসাহিত করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বড় ধরনের উৎসব ও ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর পাশাপাশি ক্যাটারিং এবং স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত পরিষেবাগুলোয় খরচ বাড়াতে চীন বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের ঘোষণা করেছে। তবে এতেই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন চীনকেন্দ্রিক গবেষণা সংস্থা ট্রিভিয়ামের বিশ্লেষকরা। এক নোটে তারা লিখেছেন, ভোক্তারা ব্যয় বাড়াচ্ছেন না। কারণ অর্থনৈতিক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং তাদের উপার্জন বৃদ্ধির হার অনেকটাই কমেছে।
দেশটির কভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম গতি হারাচ্ছে। প্রতি পাঁচজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার এবং কঠিন পরিস্থিতির কারণে পরিবারগুলো আগের চেয়ে খরচ কমিয়ে এনেছে। ট্রিভিয়ামের বিশ্লেষকরা লিখেছেন, যতক্ষণ না এ দুই সমস্যার সমাধান হবে, ততক্ষণ ব্যয় প্রবণতা কার্যকরভাবে বাড়বে না।
কাগজে-কলমে দাম কমে যাওয়াকে ক্রয়ক্ষমতার জন্য ভালো বলে মনে হলেও মুদ্রা সংকোচন দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। খরচ করার পরিবর্তে ভোক্তারা তখন কম দামের আশায় ক্রয় স্থগিত করে। ফলে চাহিদা কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
মিজুহো ব্যাংকের বিশ্লেষক কেন চেউংয়ের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চাকরি হারানো ও বেতন কমার সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে পরিবারগুলো বড় খরচের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।
আবাসন, দোকান, কারখানা বা গুদাম ইজারা দেয়া কোম্পানিগুলো (ব্রিকস অ্যান্ড মর্টার) যেকোনো দেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ। সম্পদ বাড়াতে খাতটিতে দীর্ঘকাল ধরে মধ্যবিত্ত চীনারা বিনিয়োগ করে আসছে। এখন বিপুলসংখ্যক ডেভেলপাররা আর্থিক সমস্যায় ভুগছেন। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডেভেলপারদের পাশে এগিয়ে এসেছে। চলমান প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ করতে ব্যাংক ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডেভলপারদের ঋণ পরিশোধের সুযোগ বাড়াবে। কিন্তু এতেও ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও হতে পারে মন্তব্য করে নোমুরা ব্যাংকের বিশ্লেষক টিং লু সতর্ক করেছেন।
চেউংয়ের মতে, রফতানি খাতকে স্বাভাবিক রাখতে বেইজিং ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের অবমূল্যায়ন করতে পারে। এ কৌশল চীন অতীতেও ব্যবহার করেছে। তবে এটি বিদেশে চীনা পণ্যের দামকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। বেইজিংয়ের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কিছু পশ্চিমা নেতা চীনের অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন (ডিকাপলিং) হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
