ভারত থেকে স্থল পথে সূতা আমদানি বন্ধ করে সমুদ্র পথে আনতে হবে: বিটিএমএ সভাপতি
বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত রক্ষায় বেনাপল, ভোমরা ও সোনা মসজিদ স্থল বন্দর সহ সকল স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে সূতা আমদানি বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে সমুদ্র পথে সূতা আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে।
Showkat Aziz Russell, President, Bangladesh Textile Mills Association (BTMA) এবং Chairman & Managing Director AMBER Group; মঙ্গলবার ডেইলী অবজারভারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, স্থল পথে ভারত থেকে পণ্য আমদানির নামে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউজ ব্যবহার করে ড্যাম্পিং মূল্যে সূতা ও কাপড় এনে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে টেক্সটাইল খাত রক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দেশীয় টেক্সাইল খাত রক্ষায় স্থল বন্দর দিয়ে সূতা আমদানি বন্ধ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আগে স্থল বন্দর দিয়ে সূতা আমদানি বন্ধ করা হয়েছিল বলে দেশে টেক্সটাইল খাত দ্রুত উন্নতি করে এবং এ খাতে ২২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। তিনি বলেন, সমুদ্র বন্দরকে প্রাধান্য দিয়ে স্থল বন্দর দিয়ে অবৈধ সূতা আসা বন্ধ করা সহ মিস ডিক্লারেশন বন্ধ করতে হবে। এদিকে গত বছর ভারত থেকে সূতা আমদানির পরিমাণ ছিল ২.৭ বিলিয়ন ডলার। স্থল পথে আমদানি করার ফলে সূতা ও কাপড় আমদানির পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে Showkat Aziz Russell বলেন, বর্তমানে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সংকট চলছে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে- চীনের বিনিয়োগ বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। ওই বিনিয়োগ শতভাগ বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ অর্থায়নের অভাব; ব্যাংকিং খাত সাপোর্ট দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই চীনের বিনিয়োগ অন্যদেশে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনের বিনিয়োগ পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার আরও কারণ হচ্ছে- প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিগত সরকার শত কোটি বিলিয়ন ডলার লুট করে পাচার করেছে। যার ভর্তুকী দিতে হচ্ছে- এখন প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এদিকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির উর্ধ্বগতি, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বর্ধিত ইউটিলিটি প্রাইজ সহ ব্যবসায়ীক ব্যয় বাড়ায় দেশের বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জের মুখে পরেছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্পায়নে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তার উপর টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় কাঁচামালের দাম বেড়েছে, স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগে এবং হ্রাস পেয়েছে কর্মসংস্থান। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারত বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, বাড়িয়েছে কর্মসংস্থান- যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ।
পার্শ্ববর্তী দেশ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থার জন্য তৈরি ছিল; যেকারণে তারা দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে শিল্পায়নে কোনো পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হয়নি; উপরোন্ত সব জিনিষের দাম বাড়ার ফলে শিল্পায়নে নৈতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে Showkat Aziz Russell বলেন, এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়াবার, রপ্তানিমুখী শিল্পৈর উপর সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে; সমুদ্র বন্দরকে প্রাধান্য দিয়ে স্থল বন্দর বন্ধ করতে হবে। অবৈধ আমদানি ও মিস ডিক্লারেশন বন্ধ হবে।
বিগত সরকার ঢালাওভাবে ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে কিছু লোককে ব্যাংক লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে অধিকাংশ ব্যাংক একিভুত করতে হবে। মালয়েশিয়ায় শতাধিক ব্যাংক একিভুত করে চার থেকে পাঁচটি ব্যাংক চালু করেছে। বাংলাদেশকে ব্যাংকি সেক্টরে মালয়েশিয়ার পথ অনুসরণ করতে হবে।
Showkat Aziz Russell বলেন, সরকারকে কস্ট বেনিফিট এনালাইসেস করে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে স্টীমুলাজ প্যাকেজ প্রদানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে প্রজ্ঞাপন জারি বা এসআরও জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েশন ও চেম্বারের সাথে আলোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন এসোসিয়েশন ও চেম্বারের প্রস্তাবসমূহ আলমারীতে তালাবন্ধ করে না রেখে- প্রস্তাবগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে পুরানো অভ্যাস বাদ দিয়ে নতুন করে জবাবদিহীতার মধ্যে আসতে হবে।
Showkat Aziz Russell বলেন, আগামীতে আরএমজি ও টেক্সটাইল খাতকে দ্বিগুণ করতে চাইলে আরটিফিশিয়াল ফাইবারকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি পলিসিগতভাবে এ খাতে সহায়ক করতে হবে। কারণ আরটিফিশিয়াল ফাইবার হচ্ছে- একটি সম্ভাবনাময় খাত।
তিনি বলেন, বিশ্বের ৭০ শতাংশ বাজার দখল করে আছে ‘আরটিফিশিয়াল ফাইবার;’ অথচ- এ সেক্টরে বাংলাদেশের কোনো অবস্থান নেই। এ সেক্টরে প্রবেশ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার বন্ধের নামে দেশীয প্লাস্টিক শিল্প বন্ধ করছে সরকার। এ খাতে যারা বিনিয়োগ করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পরিবেশ দুষণের নামে এসব শিল্প ও পলেথিনের ব্যবহার বন্ধ করা হচ্ছে। পলিথিন যাতে পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে; তার জন্য পলিথিনের বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে বিকল্প শিল্প স্থাপন করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
একদিকে দেশীয় পলিথিন শিল্প কারখানা বন্ধ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিদেশ থেকে প্লাস্টিক বোতল আমদানি করা হচ্ছে- যা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে গণ্য করা যায়। আমদানিকুত এসব বোতল পরিবেশের ক্ষতি করছে না বলে জানানো হয়। যদি তা্ই হয়; তাহলে বিনা বন্ডে বিনা শুল্কে বোতল আমদানি করতে দেওয়া উচিৎ; যেমন আছে তুলার ব্যাপারে।
তিনি বলেন, আরও একটি সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে- চামড়া। তিনি বলেন, সিনথেটিক বা নন লেদার সু-মেকিং ফ্যাক্টরী স্থাপন করতে হবে। যা রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। সেই সঙ্গে এ খাতে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে চামড়া খাতকে।
ইমপোর্ট সাবস্টিটিউট শিল্প বিশেষ করে টেক্সটাইল সহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের বিকল্প নেই। এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে সরকারকে মনোযোগি হতে হবে। এবং গঠনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যা বাস্তব ও সময় উপযোগি সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।
Showkat Aziz Russell বলেন, গত ১৫ বছরে যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে- তার ১০ শতাংশ যদি শিল্প খাতে বিনিয়োগ হত- তা হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হত এবং লক্ষ্য লক্ষ্য লোকের কর্সসংস্থান হত। কিন্তু তা না করে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উন্নত হওয়ার সাথে সাথে শ্রমঘন শিল্প থেকে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পের দিকে অগ্রসর হয়। এ অবস্থায় উন্নত হওয়া দেশগুলোর শ্রমঘন শিল্প তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়। যার শতভাগ সুযোগ বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারত- কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ তারল্য সংকট চলমান শিল্পকে নাজুক অবস্থায় রেখেছে। এ অবস্থায় নতুন শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
