বিলুপ্ত হচ্ছে সারচার্জ প্রথা

স্টাফ রিপোর্টার

সরকার সারচার্জ প্রথা বিলুপ্ত করে পুনরায় ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ বা ‘সম্পদ কর’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

রোববার (৫ এপ্রিল) আগারগাঁওয়ের এনবিআর ভবনে ছয়টি চেম্বারের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ কথা জানান তিনি।

আলোচনায় লাভ-লোকসান নির্বিশেষে বার্ষিক লেনদেনের ওপর ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থেকে কমানোর প্রস্তাব করে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এই ন্যূনতম কর না কমিয়ে বরং কর বাড়ানোর চাপ আছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এই কর না কমিয়ে উল্টো বৃদ্ধি করে আড়াই শতাংশ করার চিন্তা আছে।

অনুষ্ঠানে অ্যামচেমের পাশাপাশি বাজেট প্রস্তাব দেয় ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ। অংশ নেয় বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও ওমেন এন্টাপ্রেনিউরস নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।

এসময় নারী উদ্যোক্তারা জানান, ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই ভ্যাট দিতে চায় না। দেশীয় পণ্য নিয়ে যারা কাজ করে তাদের জন্য ভ্যাট শিথিল করার দাবি জানান।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা যদি স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাট রেট প্র‍্যাকটিস করি তাহলে ইফেক্টিভ ভ্যাট রেট ৩ শতাংশের বেশি হয় না। যদিও আমাদের ক্রেডিট মেকানিজম কাজ করছে না। ভ্যাট হার স্ট্যান্ডার্ড হবে। ইনপুট থেকে ফাইনাল লেভেলে ডেলিভারি পর্যন্ত একই রেট হবে। প্রত্যেকেই ক্রেডিট নেবে। অবশ্যই স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেমে যেতে হবে। রেট কম। বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম অভিযোগ করে বলেন, সারচার্জ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ‘জাস্টিফায়েবল’ বা ন্যায়সংগত নয়। কাগজে-কলমে বা বাজারমূল্যে কারও সম্পদ অনেক বেশি মনে হলেও বাস্তবে তার হাতে নগদ অর্থ বা প্রকৃত আয় না থাকতে পারে। অথচ তাকে অনেক বেশি সারচার্জ দিতে হচ্ছে।

সম্পদের সারচার্জ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, গত বছর থেকে সারচার্জের বিষয়টি অনেক সহজ করেছি, আপনি খেয়াল করছেন কি না জানি না। আগে ছিল আপনার মিনিমাম ট্যাক্স, আপনার টার্নওভার ট্যাক্স—সবকিছুর ওপর যে পরিমাণ টাকা দিতে হতো ওটার ওপরে ৩৫ শতাংশ দিতে হতো। ওই পেইনটা কিন্তু আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। সরকার এই সারচার্জ প্রথা বিলুপ্ত করে পুনরায় ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ বা ‘সম্পদ কর’ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কথা চিন্তা করছে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায্য করের বোঝা কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, যাদের সবচেয়ে বেশি, তারাই সোসাইটিতে সবচেয়ে বেশি কন্ট্রিবিউট করে। আমাদের যদি মাইন্ডসেট এমন হয়, আমার জীবদ্দশায় কে কী করবে না করবে সেটা দরকার নেই, আমি শুধু ওয়েলথ ম্যাক্সিমাইজেশন করবো, সরকারি কোষাগারে টাকা দেবো না—তাহলে দেশ চলবে কীভাবে?

বিসিসিসিআই সভাপতি খোরশেদ আলম আরও বলেন, আমার অনেক চাইনিজ মেম্বার আছেন, এখানে তাদের স্ত্রীরা আছেন। অথচ সম্পদ সিঙ্গাপুরে নিয়ে রাখেন, এখানে রাখেন না। কারণ সারচার্জ। অনেক বাঙালিও আছেন ট্যাক্সের ভয়ে তারা টাকা-পয়সা বিদেশে পাচার করছেন। আপনি এই সুযোগটা দিয়েন না। সিঙ্গাপুরে মাত্র ৭ শতাংশ সারচার্জ। জিনিসটা আপনি বিবেচনা করবেন যেন আমার দেশের থেকে সম্পত্তি, টাকা-পয়সা বিদেশে পাচার না হয়।

পোশাক খাতে বিদেশি ক্রেতাদের সুযোগ বেশি দেয় অভিযোগ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গরিব মানুষ গার্মেন্টসে চাকরি করে, রিকশা চালায়—এসব শ্রমিকের কাপড় কিনবে, সেই কাপড়ের জন্য সুতাতে ভ্যাট ধরেছেন ৫ শতাংশ। অথচ একজন বিদেশি ক্রেতা গার্মেন্টস পণ্য কিনবে, তার জন্য আপনি ইনসেনটিভ দিচ্ছেন, তার জন্য রাজস্ব নিচ্ছেন না, বন্ড ফ্রি করে দিচ্ছেন—একটু অবিচার হচ্ছে না? বিদেশি বায়ারের জন্য আপনি সুযোগ করে দিছেন গার্মেন্টস কিনতে, বন্ডে কাঁচামাল নিয়ে আসে। আমার বাংলাদেশের কি হচ্ছে না? আমাদের ৩০ শতাংশ ফ্যাক্টরি বন্ধ টেক্সটাইলের। এই দেশের সম্পদ আপনাকে বাঁচাতে হবে, এই দেশের মিলকে বাঁচাতে হবে।

এসব অভিযোগের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ম্যাক্রোইকোনমিক স্ট্যাবিলিটির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খুবই দরকার। এক্সপোর্টকে যদি আপনি উৎসাহিত না করতে পারেন এবং এক্সপোর্টের সঙ্গে এই বন্ড ফেসিলিটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং রপ্তানি বাড়াতে হবে।

বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশের নাগরিক না জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, যিনি বায়ার উনি আমার সিটিজেন না। ওনার বাংলাদেশে ট্যাক্স দেওয়ার কথা না। ট্যাক্স ১৮ কোটি মানুষ দেবে। আর মেহমানকে ট্যাক্স দিতে হয় না। সে আমার দেশে ট্যাক্স দেবে না, এটাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, যেটা করতে পারি—মিসইউজটা বন্ধ করা। যেটা আপনি বললেন যে তারা বন্ডে মালামাল এনে লোকালি বিক্রি করে দেয়। এই জায়গাটা আমাদের কড়াকড়ি করতে হবে এবং এই কড়াকড়িটা আমরা শুরু করেছি। এবারের বাজেটে বন্ডের ক্ষেত্রে আরও অনেক রকমের নিয়ম-কানুনগুলো আপনারা দেখতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *