পাকিস্তান যে ভাবে টেস্ট খেলাই ভুলে গেল!

স্টাফ রিপোর্টার

একসময় টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের নাম উচ্চারণ করলেই প্রতিপক্ষের চোখে দেখা যেত ভয়, শ্রদ্ধা আর অনিশ্চয়তা। পাকিস্তানের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের অনিশ্চয়তা—কোনো একদিন হঠাৎ এমন একজন বোলার উঠে আসবেন, যিনি পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেবেন; কোনো ব্যাটার এমন ইনিংস খেলবেন, যা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দেবে। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, ইমরান খান, সাকলায়েন মুশতাক, ইনজামাম-উল-হক, ইউনিস খান থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বাবর আজম—প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাকিস্তান টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। কিন্তু সেই পাকিস্তানকে এখন অনেক সময় মাঠে দেখে মনে হয়, তারা যেন টেস্ট ক্রিকেটের মৌলিক ভাষাটাই ভুলে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক ইংল্যান্ড সফর সেই প্রশ্নটাকে আরও জোরালো করে তুলেছে। তিন ম্যাচের সিরিজে প্রথম দুই টেস্টেই পাকিস্তান বড় ব্যবধানে হেরেছে এবং ইংল্যান্ড ২–০ ব্যবধানে সিরিজ নিশ্চিত করেছে। লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ২৯০ রান করার পর পাকিস্তান মাত্র ১১০ রানেই অলআউট হয়ে যায়। পরে ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৮ রান যোগ করে পাকিস্তানের সামনে ৩৮৯ রানের লক্ষ্য দেয়। সেই লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে পাকিস্তান ১৯৪ রানে থেমে যায়। ম্যাচটি শেষ হয় ১৯৪ রানের বড় পরাজয়ে।

এখানে সবচেয়ে বেশি হতাশার বিষয় শুধু হার নয়; বরং হারার ধরন। টেস্ট ক্রিকেটে একটি দল হারতেই পারে। প্রতিপক্ষ ভালো খেলতে পারে, উইকেট কঠিন হতে পারে, আবহাওয়া বা কন্ডিশনও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু একটি দল যখন বারবার ব্যাটিংয়ে ধসে পড়ে, নতুন বলের সামনে নিজেদের সামলাতে পারে না, চাপের সময়ে ভুল শট খেলে এবং দীর্ঘ ইনিংস গড়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে, তখন প্রশ্নটা শুধু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে আটকে থাকে না। প্রশ্ন উঠে যায় পুরো টেস্ট ক্রিকেট কাঠামো নিয়েই।

লর্ডস টেস্টের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। পাকিস্তানের প্রথম ইনিংস মাত্র ১১০ রানে শেষ হয়ে যায়। আজান আওয়াইস ৪৬ রান করে দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন। অর্থাৎ পুরো ইনিংসে বড় কোনো জুটি তৈরি হয়নি, ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর দীর্ঘ সময় চাপ সৃষ্টি করা যায়নি।

টেস্ট ক্রিকেটে ভালো দলগুলো জানে—সব বল মারতে হয় না। কিছু বল ছেড়ে দিতে হয়। কিছু সময় শুধু টিকে থাকতে হয়। নতুন বলের ঝুঁকি পার করে দিতে হয়। প্রতিপক্ষ বোলারের স্পেল শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হয়। তারপর রান করার সুযোগ খুঁজতে হয়। কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে এই ধৈর্যের ঘাটতিই এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

টেস্ট ক্রিকেট আসলে পাঁচ দিনের মানসিক যুদ্ধ। এখানে শুধু ব্যাটিং দক্ষতা থাকলেই হয় না; দরকার ধৈর্য, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, শরীর ও মনকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখার সামর্থ্য এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দেওয়ার মানসিক শক্তি। টি-টোয়েন্টির দ্রুতগতির ক্রিকেটে যে শট সফল হতে পারে, টেস্ট ক্রিকেটে একই শট অনেক সময় উইকেটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের ব্যাটাররা যদি লাল বলের ক্রিকেটের এই পার্থক্যটি ভুলে যান, তাহলে ফল এমন হওয়াই স্বাভাবিক।

লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেও পাকিস্তান কিছুটা লড়াই করার সুযোগ পেয়েছিল। ৩৮৯ রানের লক্ষ্য সহজ ছিল না, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে অসম্ভবও নয়। প্রথমদিকে উইকেট ধরে রাখতে পারলে, একটি বড় জুটি তৈরি করতে পারলে এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা গেলে ম্যাচের গল্প বদলাতে পারত। কিন্তু পাকিস্তান শুরুতেই চাপের মুখে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সৌদ শাকিল ৯৭ রানের অসাধারণ লড়াই করেন। তিনি সেঞ্চুরি থেকে মাত্র তিন রান দূরে থেমে যান। তাঁর ইনিংস ছিল পাকিস্তানের জন্য এই ম্যাচের অন্যতম উজ্জ্বল দিক।

কিন্তু একজন ব্যাটারের লড়াই দিয়ে পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ জেতা যায় না। টেস্ট জিততে হলে টপ অর্ডার, মিডল অর্ডার, লোয়ার অর্ডার—সবাইকে কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখতে হয়। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসে বড় রান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে পাকিস্তান ১১০ রানে অলআউট হয়ে নিজেদের পায়ের নিচের মাটিটাই দুর্বল করে ফেলেছিল।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বোলাররা পাকিস্তানের ব্যাটিং দুর্বলতাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। ওলি রবিনসন এই ম্যাচে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন। তিনি ম্যাচে মোট আটটি উইকেট নেন এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৪/২৪ বোলিং করে পাকিস্তানের ব্যাটিং প্রতিরোধ ভেঙে দেন। তাঁর নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেন্থ, সিম মুভমেন্ট এবং ধারাবাহিক চাপ পাকিস্তানের ব্যাটারদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করে।

এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—টেস্ট ক্রিকেটে শুধু গতি নয়, নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে পেস বোলিং সবসময় তাদের বড় শক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কতটা বজায় আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পাকিস্তানের সাবেক ফাস্ট বোলার সোহেল খানও সাম্প্রতিক সময়ে দলের টেস্ট পতনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পেস বোলিং নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

তবে পাকিস্তানের সমস্যাকে শুধু বোলিং দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত ব্যাটিংয়ে। একটি টেস্ট দলের ব্যাটিং লাইনআপে এমন কয়েকজন ক্রিকেটার প্রয়োজন, যারা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের খেলা বদলাতে পারেন। কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন রক্ষণাত্মক হতে হবে, কখন বোলারকে ক্লান্ত করতে হবে—এই ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

পাকিস্তানের বর্তমান ব্যাটিংয়ে সেই পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি ব্যাটিং অনেক সময় দেখা যায় না। একজন ব্যাটার ২০–৩০ রান করে সেট হয়ে যাওয়ার পরও অপ্রয়োজনীয় শট খেলছেন, অথবা ভালো বলের বিরুদ্ধে টিকে থাকার বদলে আক্রমণাত্মক শট বেছে নিচ্ছেন—এমন ঘটনা বারবার ঘটলে বোঝা যায়, সমস্যা শুধু টেকনিক্যাল নয়; মানসিকও।

আর এখানেই আসে ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রশ্ন। একটি শক্তিশালী টেস্ট দল তৈরি করতে হলে শক্তিশালী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রয়োজন। ব্যাটারকে চার দিনের ম্যাচে নিয়মিত ১০০, ১৫০ বা ২০০ রান করার অভ্যাস করতে হবে। বোলারকে দীর্ঘ স্পেল করার অভ্যাস করতে হবে। ফিল্ডারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে থাকার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কিন্তু কোনো দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট যদি টেস্ট ক্রিকেটের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করতে না পারে, তাহলে জাতীয় দলেও তার প্রভাব দেখা যাবে।

পাকিস্তানের আরেকটি বড় সমস্যা হলো দল নির্বাচন ও ধারাবাহিকতা। টেস্ট ক্রিকেটে একটি দলকে সময় দিতে হয়। খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট ভূমিকা দিতে হয়। একজন ওপেনারকে জানতে হবে তিনি কেন ওপেন করছেন। একজন নম্বর পাঁচের ব্যাটারকে জানতে হবে তার দায়িত্ব কী। একজন পেসারকে জানতে হবে কোন পরিস্থিতিতে তাকে আক্রমণ করতে হবে। কিন্তু ঘন ঘন পরিবর্তন হলে খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিক ক্রিকেটের আরেক বাস্তবতা। বর্তমানে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা এত বেশি যে অনেক ক্রিকেটার ছোট ফরম্যাটের ক্রিকেটে বেশি সময় কাটান। সেখানে দ্রুত রান করতে হয়, আক্রমণাত্মক হতে হয়, কয়েক ওভারের মধ্যে ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে হয়। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি ভালো ইনিংস মানে শুধু দ্রুত ৫০ রান নয়; বরং কখনো কখনো ছয় ঘণ্টা ব্যাট করে ১৫০ রান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তান যদি টেস্ট ক্রিকেটে ঘুরে দাঁড়াতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত লাল বলের ক্রিকেটের জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা। টি-টোয়েন্টির পারফরম্যান্স দিয়ে টেস্ট দলে জায়গা পাওয়া এবং টেস্টের প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকা—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।

এখানে নেতৃত্বের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন টেস্ট অধিনায়ককে শুধু মাঠে ফিল্ডিং সাজালেই হয় না। তাকে দলের মানসিকতা তৈরি করতে হয়। পাঁচ দিনের ম্যাচে কখন ঝুঁকি নিতে হবে এবং কখন সময় কিনতে হবে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হয়। একইভাবে কোচিং স্টাফকে খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল সমস্যার পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতির দিকেও নজর দিতে হয়।

তবে পাকিস্তানের ক্রিকেটে আশার জায়গাও আছে। সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। সৌদ শাকিলের ৯৭ রান দেখিয়েছে, কঠিন পরিস্থিতিতেও লড়াই করার সামর্থ্য পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মধ্যে রয়েছে। মোহাম্মদ আব্বাসের বোলিংও দেখিয়েছে, অভিজ্ঞতা এবং সঠিক জায়গায় বল করার দক্ষতা এখনও পাকিস্তানের শক্তি হতে পারে। দ্বিতীয় টেস্টে আব্বাস পাঁচ উইকেট নিয়েছেন।

অর্থাৎ সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়; বরং প্রতিভাকে ধারাবাহিক টেস্ট পারফরম্যান্সে রূপান্তর করতে না পারা। পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রতিভাবান ক্রিকেটারের অভাব কখনো ছিল না। বরং কখনো কখনো তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে প্রতিভার সঠিক ব্যবহার এবং ধারাবাহিকতা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পাকিস্তান কি আবার টেস্ট ক্রিকেটকে নিজের ক্রিকেট সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

কারণ পাকিস্তানের ক্রিকেটের পরিচয় শুধু টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডের সঙ্গে যুক্ত নয়। তাদের ক্রিকেটের একটি বিশাল ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে টেস্ট ক্রিকেটের মাধ্যমে। বিদেশের মাটিতে দুর্দান্ত পেস বোলিং, কঠিন পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস্য কামব্যাক, একজন ব্যাটারের দীর্ঘ ইনিংস কিংবা একজন স্পিনারের জাদুকরী স্পেল—এসবই পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের পরিচিত দৃশ্য।

কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে শুধু অতীতের গল্প বললে হবে না। বর্তমান প্রজন্মকে নতুন করে টেস্ট ক্রিকেট শিখতে হবে। শিখতে হবে ধৈর্য, শিখতে হবে ডিফেন্স, শিখতে হবে ভালো বলকে সম্মান করা, শিখতে হবে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিখতে হবে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে কীভাবে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের বদলে নিতে হয়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি সিরিজ পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রথম দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে পরাজয় দেখিয়েছে তাদের ব্যাটিং কতটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। দ্বিতীয় টেস্টে ম্যাচের মোট দুই ইনিংসে পাকিস্তানের রান ছিল ১১০ ও ১৯৪—অর্থাৎ পুরো ম্যাচে ৩০৪ রান। এটি ইংল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানের টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন মোট রানগুলোর মধ্যে অন্যতম।

এখন পাকিস্তানের সামনে তৃতীয় টেস্ট। সিরিজ ইতোমধ্যে ইংল্যান্ড জিতে নিয়েছে। কিন্তু শেষ ম্যাচটি পাকিস্তানের জন্য শুধুই আরেকটি ম্যাচ নয়; এটি নিজেদের সম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য একটি পরীক্ষা। একটি ভালো পারফরম্যান্স পুরো সিরিজের ফল বদলাবে না, কিন্তু সেটি পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে।

আর যদি একই গল্প আবারও দেখা যায়—দ্রুত উইকেট হারানো, ছোট স্কোর, দীর্ঘ সময় ব্যাট করতে না পারা এবং প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে অসহায় হয়ে পড়া—তাহলে প্রশ্ন আরও কঠিন হবে: পাকিস্তান কি সত্যিই টেস্ট ক্রিকেট খেলতে ভুলে গেছে?

বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান টেস্ট ক্রিকেট খেলতে ভুলে যায়নি। কিন্তু তারা হয়তো টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—ধৈর্য, পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতা—কিছুটা হারিয়ে ফেলেছে। আর এগুলো ফিরে পেতে শুধু একজন নতুন অধিনায়ক বা দুই-একজন নতুন খেলোয়াড় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, সঠিক দল নির্বাচন, লাল বলের ক্রিকেটকে অগ্রাধিকার এবং খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।

পাকিস্তানের ক্রিকেটের ইতিহাস বলে, তারা কখনোই দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকে না। তারা যেমন হঠাৎ করে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তেমনি হঠাৎ করেই অপ্রত্যাশিতভাবে ভেঙেও পড়তে পারে। তাই আজকের এই দুর্দশাই হয়তো তাদের শেষ পরিচয় নয়। কিন্তু পরিবর্তন না আনলে ইতিহাসের গৌরব দিয়ে বর্তমানের ক্রিকেট জেতা যাবে না।

একসময় পাকিস্তানের পেসারদের বিরুদ্ধে ব্যাটাররা রাতের ঘুম হারাতেন। পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে বলা হতো ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিভায় ভরা। আজ সেই দলই বিদেশের মাটিতে বারবার ব্যাটিং ধসে পড়ছে। তাই প্রশ্নটা এখন খুবই স্বাভাবিক—পাকিস্তান কি টেস্ট ক্রিকেট খেলাই ভুলে গেল?

উত্তরটা হয়তো পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ নয়। বরং বলা যায়, পাকিস্তানকে আবার নতুন করে টেস্ট ক্রিকেট শিখতে হবে—খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ক্রিকেট সংস্কৃতি হিসেবে।

কারণ টেস্ট ক্রিকেট শুধু ব্যাট-বলের খেলা নয়। এটি ধৈর্যের পরীক্ষা, চরিত্রের পরীক্ষা এবং পরিকল্পনার পরীক্ষা। যে দল পাঁচ দিন ধরে নিজের পরিকল্পনায় অটল থাকতে পারে, শেষ পর্যন্ত সেই দলই টেস্ট ক্রিকেটে সফল হয়। পাকিস্তান যদি সেই মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে তাদের পুরনো গৌরব ফিরে আসা অসম্ভব নয়।

কিন্তু তার জন্য এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি শুধু টি-টোয়েন্টির যুগের বিনোদননির্ভর ক্রিকেট দল হতে চায়, নাকি আবারও টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

১৯৪ রানে হেরে সিরিজ খোয়ালো পাকিস্তান

প্রথম টেস্টের মতো ইংল্যান্ডের কাছে লর্ডসেও বড় ব্যবধানে হেরেছে পাকিস্তান। এই টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে না হারলেও পরাজয়টা ১৯৪ রানের। টানা দুই টেস্ট জিতে নিয়ে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-০ তে নিজেদের করে নিয়েছে ইংল্যান্ড।

দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৮ রানে অলআউট হয়েছে ইংল্যান্ড। কিন্তু প্রথম ইনিংসেই পাকিস্তানের চেয়ে ১৮০ রানের এগিয়েছিল স্বাগতিক ইংলিশরা। ফলে পাকিস্তানের সামনে ইংল্যান্ডের সর্বমোট লিড দাঁড়ায় ৩৮৮ রান।

চতুর্থ ইনিংসে বড় এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৯৪ রানে অলআউট হয়ে ১৯৪ রানেই হেরেছে বাবর আজমের দল। খুব একটা লড়াইও করতে পারেনি স্বাগতিকরা।

পাকিস্তানের হয়ে একা লড়াই করেন কেবল সৌদ শাকিল। তার ব্যাটে আসে ৯৭ রান। ১৩ চার ও ২ ছক্কায় সাজানো ছিল তার ইনিংস। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ রান করেন শান মাসুদ। দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যর্থ হয়েছেন চোট কাটিয়ে এই টেস্টে ফেরা অধিনায়ক বাবর আজম। করেছেন মাত্র ৬ রান। চোটের কারণে ব্যাটিং করতে পারেননি ইমাম-উল-হক।

পাকিস্তানের ইনিংসে ধস নামান ইংল্যান্ডের ৩ পেসার। সর্বোচ্চ ৪ উইকেট পান ওলি রবিনসন। ৩টি জশ টাং ও দুটি জোফরা আর্চার।

এর আগে, ২০৮ রানে থামে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস। ৭ উইকেটে ১৭৭ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করা ইংলিশরা আর যোগ করে ৩১ রান। ড্যান লরেন্স তাদের হয়ে সর্বোচ্চ ৫৪ রান করেন। ৩৪ ও ২৪ রান আসে হ্যারি ব্রুক ও জো রুটের ব্যাটে।

পাকিস্তানের হয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন মোহাম্মদ আব্বাস। দুটি করে মোহাম্মদ আলী ও খুররম শাহজাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *