৮০ কোটি তরুণের চাকরি নিয়ে ভয়াবহ দুসংবাদ দিলেন অজয় বাঙ্গা
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ১২০ কোটি তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন, অথচ ধারণা করা হচ্ছে, তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে মাত্র ৪০ কোটি। এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। ফলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮০ কোটি। এই তরুণ প্রজন্মই এই শতাব্দীর নেতৃত্ব দেবে বলে তিনি মনে করেন।
এ বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে। রোববার এ সভা শেষ হয়।
সমাপনী বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বলেন, তারপরও এই প্রজন্মই আগামী শতাব্দীকে রূপ দেবে। আজ আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নেব, তা-ই নির্ধারণ করবে সেই ভবিষ্যৎ কেমন হবে। আমরা মূলত, দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছি: সীমিত সম্পদকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় এবং বিভিন্ন দেশে কীভাবে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। এই দুটি বিষয়কে একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।
গত তিন বছর ধরে আমি এই বার্ষিক সভাগুলোকে কাজে লাগিয়েছি আমাদের চলমান কার্যক্রম, গৃহীত পরিবর্তনসমূহ এবং এর পেছনের লক্ষ্যগুলো তুলে ধরার জন্য। এ বছর আমি আমাদের অর্জিত অগ্রগতি এবং তা আমাদের কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, তার ওপর আলোকপাত করতে চাই। উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিকে- প্রতিটি দেশের সুনির্দিষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে একত্রিত করার ওপর।
অজয় বাঙ্গা আরও বলেন, দেশগুলোর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই অংশীদারত্ব এবং সহায়তার ধরনও পরিবর্তিত হওয়া উচিত। যেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেখানে সরকারি ও নমনীয় শর্তযুক্ত (কনসেশনাল) অর্থায়ন অপরিহার্য থাকবে। দেশগুলো যত শক্তিশালী হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশাধিকার তত বড় ভূমিকা পালন করবে।
স্পষ্ট করে বলতে গেলে, আমাদের সাফল্য তখনই আসে, যখন কোনো দেশের কাছে আমাদের আর প্রয়োজন থাকে না। আমরা এমন যাত্রাপথ দেখেছি, যেখানে ৩৫টি দেশ আইডিএ থেকে আইবিআরডিতে উন্নীত হয়েছে। ২৩টি দেশ এখন নিজেরাই আইডিএতে অনুদানদাতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে। আমরা ঠিক এটাই চাই, আর আমাদের কৌশলটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন এই অগ্রগতি সম্ভব হয়।
এর শুরুটা হয়েছিল বিশ্বব্যাংক গ্রুপে পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমরা প্রকল্পের প্রস্তুতির সময়কাল ১৯ মাস থেকে কমিয়ে ৯ মাসে নামিয়ে এনেছি। ১৫৩টি স্কোরকার্ড পরিমাপকের পরিবর্তে প্রভাবকেন্দ্রিক ২২টি পরিমাপক নির্ধারণ করেছি।
ফলাফলভিত্তিক অর্থায়নের হার মোট অর্থায়নের এক-তৃতীয়াংশ থেকে বাড়িয়ে অর্ধেক করেছি। সরকারি ও বেসরকারি খাতের দলগুলোকে সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব কৌশলের ভিত্তিতে একত্রিত করেছি। এ ছাড়া, আমাদের ব্যালান্স শিট পুনর্গঠন করেছি, যার ফলে এক দশকে আইবিআরডির ঋণ প্রদানের সক্ষমতা ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমরা বিভিন্ন বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাকেও সহজতর করছি। আমাদের ডিজিটাল সহ-অর্থায়ন প্ল্যাটফর্মে প্রকল্পের সংখ্যা দুই বছরে তিন গুণ বেড়ে প্রায় ২৫০টিতে দাঁড়িয়েছে, যার জন্য ১৩৮ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রয়োজন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে একে অপরের কাজের ওপর নির্ভর করে আমরা কাজের পুনরাবৃত্তি কমিয়ে আনছি এবং এই মডেলটিকে আরও প্রসারিত করছি।
সামগ্রিকভাবে, এই পরিবর্তনগুলো আমাদের সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের কর্মসংস্থান কৌশল এই প্রচেষ্টাকে একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। ‘জবস কাউন্সিল’ বিভিন্ন দেশ ও খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন সব নীতি ও কর্মসূচি চিহ্নিত করেছে, যা আরও বেশি এবং উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এই কৌশলটি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটি হলো- ভৌত ও মানব অবকাঠামো।
তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন এবং ডিজিটাল সংযোগ প্রয়োজন। আর মানুষের প্রয়োজন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা। গত বছর আমরা আমাদের মোট অর্থায়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৪০ বিলিয়ন ডলার, এই ভিত্তিগুলো গড়ে তোলার কাজে বিনিয়োগ করেছি।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক নিশ্চয়তা। ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসার জন্যই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন এবং সুস্পষ্ট নিয়মাবলি জরুরি- যার মধ্যে রয়েছে সহজতর অনুমতি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুনির্দিষ্ট ও পূর্বাভাসযোগ্য ভূমি আইন। গত বছর আমাদের সরকারি খাতের অর্থায়নের ৩০ শতাংশ নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজে ব্যয় হয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন বিনিয়োগের পরিধি বা স্কেল। শক্তিশালী ভিত্তি এবং স্পষ্ট নিয়মাবলি থাকা সত্ত্বেও কিছু ঝুঁকি বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ‘প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ল্যাব’ আমাদের এই বাধাগুলো- যেমন মুদ্রাজনিত ঝুঁকি বা অর্থায়নের সুযোগ- চিহ্নিত করতে এবং সেগুলো মোকাবিলার উপায়গুলো- যেমন গ্যারান্টি, ইকুইটি ও স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে। এভাবেই আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি বেসরকারি পুঁজি নিয়ে আসছি।
এর ফলাফলও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। আমাদের কর্মপরিকল্পনা শুরুর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ অর্থবছরে, আমরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ করেছিলাম। গত বছর এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে অর্থাৎ তিন গুণ বৃদ্ধি। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট অর্থায়নের পরিমাণ ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এর সুফল সব ক্ষেত্রেই অনুভূত হচ্ছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পুঁজি সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চার গুণ এবং পুরো আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
তবে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে- যেখানে বাণিজ্যিক পুঁজি আকর্ষণ করা সবচেয়ে কঠিন- সেখানে পুঁজি সংগ্রহের হার অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। সবচেয়ে দরিদ্র ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোতে উন্নয়নের পথটি তাদের ছোট ব্যবসার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিগুলো যেখানে এখনো পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে এই ছোট ব্যবসাগুলোই গড়ে উঠছে। আমাদের নতুন এমএসএমই কৌশলের লক্ষ্য হলো : এমন সব জায়গায় পৌঁছানো, যেখানে সুযোগ পাওয়া সবচেয়ে কঠিন। বিনিয়োগে অংশগ্রহণের পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে।
গত বছর আমরা ১১০টি দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পুঁজি সংগ্রহ করেছি। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারত ছিল অগ্রগণ্য। পাশাপাশি রোমানিয়া, চিলি, পোল্যান্ড ও ব্রাজিল থেকেও বিনিয়োগ এসেছে। আরও বেশি দেশ এখন বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ জোগাচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, আমাদের অর্থায়ন এবং সংগৃহীত বেসরকারি পুঁজির প্রায় ৫৫ শতাংশই গেছে অবকাঠামো ও জ্বালানি, কৃষি-ব্যবসা, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদনশিল্পের মতো খাতগুলোতে- যেসব খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা বিশেষভাবে কাজ করছি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের জলবায়ু-সংক্রান্ত সামগ্রিক সহায়তার পরিমাণ ৯৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৪৮ বিলিয়ন ডলার এসেছে বেসরকারি পুঁজি থেকে। ৯৬ বিলিয়ন ডলার। একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান। মাত্র এক বছর। তবে অর্থায়ন কেবল শুরুর ধাপ মাত্র।
তিনি আরও বলেন, মূল বিষয়টি হলো, প্রতিটি দেশ যা অর্জন করতে চায়, তার চারপাশে প্রয়োজনীয় সক্ষমতাকে একত্রিত করা। আর ঠিক এ কারণেই বিভিন্ন দেশের জন্য প্রণীত কৌশল এবং চুক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো: এমন এক রোডম্যাপ, যা কোনো দেশের নিজস্ব লক্ষ্য, সম্মিলিতভাবে অর্জনযোগ্য ফলাফল এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। প্রতিটি রোডম্যাপ সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র, তবে এর পেছনের শৃঙ্খলা থাকে অটুট।
আমরা শুরু থেকেই সরকারি ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাই। যেখানে সরকারি বা নমনীয় অর্থায়নের প্রয়োজন, সেখানে আমরা আইডিএ এবং আমাদের নিজস্ব ব্যালান্স শিট ব্যবহার করি। পাশাপাশি জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখি এবং যেখানে বাজার অনুকূল, সেখানে বেসরকারি পুঁজিকে আকৃষ্ট করি।
প্রযুক্তি আমাদের এই কাজকে আরও বেগবান করে। ‘বিগ এআই’ বা বৃহৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজন বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা, জ্বালানি, ডেটা, বিশেষায়িত দক্ষতা ও পুঁজি- যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের নাগালের বাইরে। তবে ব্যবহারিক বা ‘ছোট’ আকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একজন কৃষককে ফসলের ফলন বাড়াতে, শিক্ষককে পাঠদান পদ্ধতি আরও কার্যকর করতে, স্বাস্থ্যকর্মীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা একজন উদ্যোক্তাকে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই আমরা বিভিন্ন দেশকে বিদ্যুৎ সুবিধা, সংযোগ ব্যবস্থা, ডিভাইসের প্রাপ্যতা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করছি, যাতে এসব প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। দক্ষতা উন্নয়নও এই প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে দেশগুলোর গড়ে তোলা কর্মসংস্থান ও শিল্পের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। এই সপ্তাহের শুরুতে আমরা আমাদের এমএসএমই কৌশল চালু করেছি, যার লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে আরও দৃশ্যমান, সংযুক্ত, সক্ষম এবং অর্থায়নের সুযোগপ্রাপ্ত করে তোলা। এর আওতায় ডিজিটাল নথিপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, ছোট ব্যবসাগুলোকে বড় ক্রেতা ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাদের বিকাশের পথে থাকা জটিল নিয়মকানুন সহজতর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে- যেখানে বড় কোম্পানিগুলোর টিকে থাকার মতো পরিবেশ এখনো গড়ে ওঠেনি- সেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমাদের প্রতিটি কাজের মূলে রয়েছে টেকসই অবকাঠামো ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যাতে অর্জিত অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। একেই আমরা বলি ‘স্মার্ট উন্নয়ন’। আমাদের এই কর্মপদ্ধতি ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনছে।
অজয় বাঙ্গা আরও বলেন, শুরু করা যাক জ্বালানি খাত দিয়ে। ‘মিশন ৩০০’-এর আওতায় আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে আফ্রিকার ৩০ কোটি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া। এখন পর্যন্ত ৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। এই অগ্রগতির গতিও ত্বরান্বিত হয়েছে- ২০২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ, ২০২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৮০ লাখ এবং গত বছর ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে।
তবে কেবল বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়াটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। বাড়িঘর, খনি, কারখানা, কৃষি খামার এবং ক্রমবর্ধমান শহরগুলোর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ (বেসলোড পাওয়ার)।
আমাদের কৌশলটি সুষম। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবিদ্যুৎ, প্রয়োজনে প্রাকৃতিক গ্যাস, যৌক্তিক ক্ষেত্রে পারমাণবিক শক্তি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, গ্রিড ও সংরক্ষণব্যবস্থার সমন্বিত মিশ্রণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নে সহায়তা করা- যা গত ৫০ বছরের মধ্যে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ।
পানির ক্ষেত্রে, আমাদের লক্ষ্য হলো অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের জন্য পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ৪০ কোটি মানুষের জন্য কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্বব্যাংকপ্রধান আরও বলেন, ২০টি দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি আমাদের ১৫ কোটি (১৫০ মিলিয়ন) মানুষের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছে। আরও ২০টি চুক্তি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কৃষিখাতে বেসরকারি খাত, জনহিতৈষী সংস্থা এবং বিভিন্ন অংশীদার মিলে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ কোটি (৩০০ মিলিয়ন) ক্ষুদ্রচাষিকে কেবল জীবনধারণের জন্য চাষাবাদ থেকে বেরিয়ে উদ্বৃত্ত উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ২০ কোটি (২০০ মিলিয়ন) কৃষকের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
‘অ্যাগ্রিকানেক্ট’-এর প্রথম পূর্ণ বছরে আমরা ৮ কোটি ২০ লাখ (৮২ মিলিয়ন) কৃষককে সহায়তা করার একটি প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছি এবং পরবর্তী ১১ কোটি ৮০ লাখ (১১৮ মিলিয়ন) কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি।
জাপান সরকারের সহায়তায় পরিচালিত ‘হেলথওয়ার্কস’-এর মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) মানুষের কাছে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। এর মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি (৬০০ মিলিয়ন) মানুষের কাছে এরই মধ্যে সেবা পৌঁছে গেছে।
একই মডেল এখন নতুন নতুন ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। যেমন- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে আমরা আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কার্যক্রম পাঁচ গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। এ সপ্তাহে আমরা বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি) অংশীদারদের সঙ্গে আমাদের প্রথম কয়েকটি দেশের চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। এর উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মূল্য নিজ দেশেই ধরে রাখা। আমরা এমন ২০টি দেশকে চিহ্নিত করেছি, যাদের সঙ্গে এ কাজে অংশীদারত্ব করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক করিডোরগুলোর ক্ষেত্রে গত বছর আমরা ৫২টি নতুন প্রকল্প শুরু করেছি, যা তিন বছর আগের ২০টি প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। ইউরোপীয় কমিশনের ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’, ইতালির ‘মাত্তেই প্ল্যান’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিএফসি’-এর মতো অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে আমরা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগকে একত্রিত করছি।
অবকাঠামো বিভিন্ন স্থানকে সংযুক্ত করে, আর এই সংযোগের পথ ধরেই নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হয়। যেমন-লোবিতোতে খনিজ পরিবহনের জন্য তৈরি রুটটি এখন কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে পৌঁছে দিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বিভিন্ন শহর ও নগরের বিকাশে সহায়তা করছে।
ভিন্ন ভিন্ন খাত, ভিন্ন ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভিন্ন সমাধান- তবে সবার লক্ষ্য একটাই: উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
পরবর্তী ধাপ হলো বড় পরিসরে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা। এর অর্থ হলো, বেসরকারি খাতের গ্রাহকেরা যেখানে বিনিয়োগ করেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, ঠিক সেখানেই তাদের কাছে পৌঁছানো। আমরা নিউইয়র্ক, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিলান ও টোকিওতে আমাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করছি, যাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, দ্রুত সমস্যার সমাধান করা যায় এবং আরও শক্তিশালী কর্মপরিকল্পনা বা পাইপলাইন গড়ে তোলা যায়।
তবে কেবল শক্তিশালী পাইপলাইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে: একটি ডলার একই সময়ে কেবল একটি জায়গাতেই থাকতে পারে। কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করলে সেই পুঁজি কয়েক দশকের জন্য আটকে যায়। ফলে তা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহব্যবস্থা, রেল করিডোর বা ক্লিনিক নির্মাণের জন্য আর ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। অথচ পেনশন তহবিল, বিমা কোম্পানি এবং সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর কাছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সন্ধানে থাকা বিপুল পরিমাণ পুঁজি রয়েছে। আমরা এখন এই দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজ করছি।
ছয়টি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক বিনিয়োগ মূল্যায়ন, নথিবদ্ধকরণ, প্যাকেজ তৈরি এবং হস্তান্তরের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তুলছে। এর ফলে আজ আমরা যে প্রকল্পে অর্থায়ন করছি, আগামীকাল তা অন্য কোনো বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। এতে আমাদের পুঁজি মুক্ত হবে এবং আমরা পরবর্তী নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারব।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাজারের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি বারবার চলতে থাকলে তা আরও বড় কিছু সৃষ্টি করবে: একটি ‘উদীয়মান বাজার উন্নয়ন সম্পদ শ্রেণি’। আমরা যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমাদের ব্যালান্স শিটের আকার আর আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকবে না। বরং আমরা উন্নয়নের গতিপথ চিরতরে বদলে দিতে পারব।
আমি আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই সেই জায়গা থেকে, যেখান থেকে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে, যখন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ চলছিল, তখন ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা নিউ হ্যাম্পশায়ারের পাহাড়ি এলাকায় একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সামনে নিজেদের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে, তারা একটি বড় বাজি ধরেছিলেন: একটি জাতির পুনর্গঠন অন্য জাতিগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব।
তারা কেবল দাতব্য কাজের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেননি, তারা গড়ে তুলেছিলেন একটি ব্যাংক ও একটি তহবিল। তারা এমন একটি সত্য বুঝেছিলেন, যা আমাদের কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয়- সমৃদ্ধি এমন কোনো পুরস্কার নয়, যা এক দেশ অন্য দেশের কাছ থেকে জিতে নেয়; বরং এটি এমন এক অগ্নিশিখা, যা তার নাগালের মধ্যে থাকা প্রতিটি ঘরকে উষ্ণ করে তোলে।
দেশগুলোর প্রয়োজনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটিও নিজেকে বদলেছে- উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের নতুন উপায় খুঁজে বের করেছে এবং বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা করেছে। কয়েক দশক ধরে কাজের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে গভীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। আমাদের কর্মীরা সেই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দক্ষতা এক দেশের অর্জিত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে অন্য দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনায় রূপান্তর করে। তাদের নিষ্ঠা সেই সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়, যা বয়ে আনে অগ্রগতি।
তারাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি, আর তাদের কারণেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বড় প্রত্যাশা রাখতে পারি।
আজ আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা যেন একটি গাণিতিক হিসাব: প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি। এই সংখ্যার আড়ালে রয়েছেন এমন এক তরুণী, যার ডিগ্রি আছে কিন্তু কোনো কর্মসংস্থান নেই; এমন এক তরুণ, যার কারিগরি দক্ষতা আছে কিন্তু বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। একটি পুরো প্রজন্ম আজ প্রশ্ন করছে, ‘আমার কি কোনো জায়গা আছে?’
একটি কর্মসংস্থান কেবল কোনো পরিসংখ্যান নয়; কর্মসংস্থান হলো মানুষের মর্যাদা।
তরুণদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এমন একজন তরুণ, যে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে তুলতে পারে, এবং এমন একজন তরুণ, যে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বসে আছে- এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য। যদি এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর যদি একে সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে তার সুফলও সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই উন্নয়ন হলো আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের একটি বিনিয়োগ।
এই প্রতিষ্ঠানটি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছে। আমাদের লক্ষ্য গত প্রজন্মের উন্নয়ন মডেলের পুনরাবৃত্তি করা নয়, বরং এমন একটি মডেল গড়ে তোলা, যা পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম। এমন একটি মডেল, যা দেশগুলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও বিকশিত হয়।
যেখানে বাজার পৌঁছাতে পারেনি, সেখানে সরকারি অর্থায়ন; যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, সেখানে বেসরকারি পুঁজি; প্রাথমিক ঝুঁকি গ্রহণ ও নতুন ধারণার উন্মেষ ঘটাতে জনহিতকর উদ্যোগ; এবং প্রতিটি ডলারের সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার- এই সবকিছুকে সমন্বিত করে প্রতিটি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
উন্নয়নের এমন একটি ভবিষ্যতের লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কর্মসংস্থানের ঘাটতি কেবল একটি প্রাক্কলনমাত্র; এটিই আমাদের অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। এই মডেলটি কী অর্জন করতে পারে, আমরা তা দেখাতে শুরু করেছি। এখন প্রয়োজন পরবর্তী প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী এর পরিধি ও গতি বাড়ানো। এই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের জুন মাসে বিশ্বব্যাংক গ্রুপে যোগদানের আগের মাসগুলোতে বিভিন্ন অংশীদার, গ্রাহক, বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দ, দাতব্য সংস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনটি বাস্তবতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। চ্যালেঞ্জগুলো ছিল বিশাল। সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল প্রকট। আর বিশ্বব্যাংক গ্রুপকে তখন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিকূলতা কমেনি। সংঘাত এখনো চলমান। সরকারি অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। ঋণের বোঝা বেড়েছে। জ্বালানি থেকে শুরু করে সার- সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো চড়া। একই সময়ে জনমিতিক বা ডেমোগ্রাফিক ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তন ঘটছে।
