বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের নীরব বিপ্লব
বাংলাদেশের বাজারে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি)। জীবাশ্ম জ্বালানির সংকটে ইলেকট্রিক স্কুটার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে হু হু করে। উভয় বাহনে চীনের একক আধিপত্য। চার চাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির ব্র্যান্ডের গাড়ি থাকলেও বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ শেয়ার চীনা ব্র্যান্ডের দখলে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলক সাশ্রয়ী, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিক্রয়োত্তর সেবায় ভর করে দেশের বাজারে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলছে চীনা ইভি।
দেশে বিদ্যুৎচালিত গাড়ির (ইভি) মধ্যে স্কুটার ও ব্যক্তিগত গাড়ি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাজারে বর্তমানে টেসলা, মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, অডি, বিওয়াইডি, ডিপাল ও এমজি ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বেশি এগিয়ে চীনা ব্র্যান্ড বিওয়াইডি। প্রায় সমানতালে বিক্রি হচ্ছে চীনা ব্র্যান্ড ডিপাল ও এমজির বৈদ্যুতিক গাড়িও।
আরও পড়ুন
বৈদ্যুতিক গাড়িতে বড় ছাড়, কমবে দাম, বাড়বে বিনিয়োগ
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে চীনা ইভির দাম ৩৫ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মধ্যে। বিপরীতে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের ইভির দাম অনেকটাই আকাশ ছোঁয়া। আর দেশে বিদ্যুৎচালিত স্কুটারের মধ্যে ইয়াদিয়া, রিভো, টেইলজি ও রাইডো উল্লেখযোগ্য। স্কুটারের প্রায় পুরো বাজারই চীননির্ভর।
বিজ্ঞাপন
দেশের বাজারে বছরে ২০০ থেকে ২৫০টির বেশি ইভি গাড়ি বিক্রি করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিন ব্র্যান্ড মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ ও অডি। চীনা ডিপাল ও এমজি ব্র্যান্ডের ইভি বিক্রির সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি ইভি বিক্রি করেছে চীনা ব্র্যান্ড বিওয়াইডি, যেখানে দেশে এখন পর্যন্ত তিন হাজার ইভি বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির ব্র্যান্ডে কর্মরত কর্মকর্তারা বলছেন, ৩৫ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা দামের গাড়ির বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এ দামের মধ্যে নতুন গাড়ি কিনতে আগ্রহী মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন চীনা ইভির দিকে ঝুঁকছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ একটি ব্র্যান্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে বিওয়াইডি অবিশ্বাস্য রকম সাড়া ফেলেছে। একসঙ্গে একই ব্র্যান্ডের ১০০টি নতুন গাড়ি বিক্রি হওয়া দেশের বাজারে আগে দেখা যায়নি। এটি একেবারেই নজিরবিহীন।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির বড় অংশই চীনা। মোট ইভি গাড়ির প্রায় ৭০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত চীনা ব্র্যান্ডের হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই।’
এদিকে, দেশে ইলেকট্রিক স্কুটারের বাজারও দ্রুত বড় হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে যেখানে মাসে মাত্র ৯৬৯টি স্কুটার বিক্রি হয়েছিল, চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৪১৪টি। এর আগে জ্বালানি সংকটের মধ্যে গত এপ্রিলে মাসিক বিক্রি বেড়ে প্রায় পাঁচ হাজারে উঠেছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কম পরিচালন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের কারণে ইলেকট্রিক স্কুটারের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
শিল্প খাতটির তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বরে ৯৬৯টি ইলেকট্রিক স্কুটার বিক্রি হলেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫২৯টিতে। মার্চে বিক্রি হয় প্রায় দুই হাজার ৫শটি এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ হাজার স্কুটার বিক্রি হয়।
এরপর মে মাসে বিক্রি কমে প্রায় তিন হাজারে নামলেও জুনে তা আবার বেড়ে ৩ হাজার ৮শ, জুলাইয়ে ৩ হাজার ৭৭৫ এবং আগস্টে বিক্রি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪১৪টিতে। এছাড়া গত ডিসেম্বরে ১২শ ৮৯ ও জানুয়ারিতে ১৪শ ১৭টি স্কুটার বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নিয়েছে ৮২৬টির বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি। এর মধ্যে ২০২১ সালে চারটি, ২০২২ সালে দুটি, ২০২৩ সালে ৩৮টি, ২০২৪ সালে ৬৬টি ও ২০২৫ সালে ২৩৮টি বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধন নেয়। সবশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরে নিবন্ধন নিয়েছে ৪৭৮টি বৈদ্যুতিক গাড়ি।
ইভি বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের দখলে, দাবি আকিজের
দেশের বাজারে ইলেকট্রিক মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক যানবাহন বিক্রি করছে আকিজ ভেঞ্চার্স। দেশের ইভি বাজারের তিন শতাংশ প্রতিষ্ঠানটির দখলে। জানতে চাইলে আকিজ রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যান্ড অটোমোবাইলস লিমিটেডের ব্র্যান্ড ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার এ এম রাকিবুল আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশের ইভি বাজার মূলত চীননির্ভর। বর্তমানে দেশের মোট ইভি বাজারের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনা গাড়ি। আমাদের আকিজ ভেঞ্চার্সের আনা গাড়িগুলোও চীন থেকে আমদানি করা। এর মধ্যে শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি রেঞ্জ এক্সটেন্ডেড ইলেকট্রিক ভেহিক্যালও আছে।’
নকশা, প্রযুক্তি ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে চীনা ইভি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে মনে করেন রাকিবুল আহসান। তিনি বলেন, ‘চীনা গাড়িগুলোর নকশা সুন্দর, ব্যবহারও সুবিধাজনক। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জ্বালানি খরচ নেই বললেই চলে। আমাদের কিছু ইভি গাড়িপ্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১ টাকা ৬০ থেকে ১ টাকা ৭০ পয়সা খরচে চলে। যেখানে জ্বালানিচালিত গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ অনেক বেশি।’
চীনের ই-বাইক বাজারে এগিয়ে থাকার কারণ সম্পর্কে রানার অটোমোবাইল পিএলসির ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজার টি এম আসিবুল ইমরান বলেন, ‘চীনই প্রথম বৈদ্যুতিক বাইক নিয়ে কাজ শুরু করে। অন্যরা যখন ইঞ্জিনচালিত বাইক নিয়ে কাজ করছিল, তখন তারা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গবেষণায় আগে থেকেই এগিয়ে থাকায় তাদের বড় সুবিধা হয়েছে।’
এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণও চীনে সহজলভ্য জানিয়ে বলেন, ‘ফলে নিজেদের সম্পদ ও কাঁচামাল কাজে লাগিয়ে তারা বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে পেরেছে।’
দেশে চীন ছাড়া অন্য দেশের ই-বাইক নেই বললেই চলে মন্তব্য করে রানারের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে চীনের বাইরে অন্য দেশের ই-বাইক খুব বেশি নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে যারা বৈদ্যুতিক বাইক আমদানি করছেন, তাদের বেশিরভাগই চীন থেকে আনছেন। ফলে দেশের ই-বাইক বাজার মূলত চীননির্ভর।’
দেশে বিওয়াইডির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি বাজারজাত করছে। দেশের রাস্তায় এখন দেড় হাজারের বেশি বিওয়াইডি গাড়ি রয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিওয়াইডি বাংলাদেশের চিফ মার্কেটিং অফিসার ইমতিয়াজ নওশের বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি ব্যবহারের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ও আমদানি শুল্ক ছাড় পদক্ষেপের ফলে সার্বিকভাবে স্থানীয় ইভি খাতের সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। এক্ষেত্রে, এ খাতের ‘ফাস্ট মুভার’ হওয়ায় অর্থাৎ আগেভাগে এ বাজারে প্রবেশ করায় চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।’
নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য যে কোনো গাড়ির মতো চীনা ইভিকেও ইঞ্জিনিয়ারিং, সেফটি টেকনোলজি, টেস্টিং ও সামগ্রিক বিল্ড কোয়ালিটির মতো বিষয় দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। বিওয়াইডির কাছে গাড়ির নিরাপত্তা সব সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘ব্লেড ব্যাটারি ও ব্যাটারি প্রোটেকশন থেকে শুরু করে গাড়ির স্ট্রাকচার ও ইন্টেলিজেন্ট সেফটি ফিচার, প্রতিটি বিষয়ই নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি গাড়ি কতটা নিরাপদ, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট মডেলের সেফটি পারফরম্যান্স ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর। বিওয়াইডি সেই মান বজায় রাখার ওপরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে।’
