প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাননি ভালোই করেছেন? ব্রিকস সম্মেলনের হোটেলে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ও তেলাপোকা
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন সামনে রেখে পাঁচতারকা হোটেলে খাদ্য নিরাপত্তার এমন চিত্র—উদ্বেগের কারণ কি শুধু অতিথিদের জন্য, নাকি ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও?
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে যখন বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই সামনে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ব্রিকস সম্মেলনের অতিথিদের থাকার জন্য নির্ধারিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দুটি পাঁচতারকা হোটেল—আন্দাজ দিল্লি ও জেডব্লিউ ম্যারিয়ট—পরিদর্শন করে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI একাধিক গুরুতর অনিয়মের কথা জানিয়েছে।
৮৭ কেজি মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি!
আন্দাজ দিল্লির মিষ্টান্ন তৈরির বিভাগে প্রায় ৮৭ কেজি মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি পাওয়া যায়। সেগুলো ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হয়। শুধু মিষ্টিই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ স্টিকারযুক্ত রুটির প্যাকেট এবং মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া কেকের বেসও পাওয়া গেছে বলে FSSAI-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ওই হোটেলের পেস্ট্রি ও রান্নাঘর এলাকায় তেলাপোকা, মাছি এবং অন্যান্য পোকামাকড়ের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও খাবারের সংস্পর্শে আসা পৃষ্ঠ ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতিও ধরা পড়ে।
জেডব্লিউ ম্যারিয়টে ৫৯টি অনিয়ম
অন্যদিকে, জেডব্লিউ ম্যারিয়ট দিল্লিতে পরিদর্শনের সময় ৫৯টি ঘাটতি নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে ভারতীয় ও বেকারি রান্নাঘরে তেলাপোকা এবং সবজি সংরক্ষণ এলাকায় ফ্রুট ফ্লাই পাওয়া যায়। সংরক্ষণ ব্যবস্থাতেও ছিল নানা সমস্যা। এমনকি কিছু পচা ফল ও সবজিও পাওয়া যায়।
খাবারের লেবেলিং নিয়েও গুরুতর ভুল ধরা পড়ে। একটি কনটেইনারে চিংড়ি থাকলেও সেটিতে ‘জুস’ লেখা ছিল এবং অন্যদিকে জুসের কনটেইনারে চিংড়ির লেবেল লাগানো ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের ভুল খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি অ্যালার্জি ও ক্রস-কনটামিনেশনের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটাই কি পাঁচতারকা মান?
ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের আগে অতিথিদের থাকার জন্য নির্বাচিত হোটেলগুলোর রান্নাঘরেই যদি মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, পোকামাকড়, পচা খাদ্য, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি ধরা পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড বাস্তবে কতটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এসব ঘটনা সামনে আসার অর্থ এই নয় যে ব্রিকস সম্মেলনের সব খাবার অনিরাপদ ছিল বা সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক অতিথি ঝুঁকিতে ছিলেন। বরং FSSAI-এর পরিদর্শনেই অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলোকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাও করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
‘প্রধানমন্ত্রী ভারতে যাননি ভালোই করেছেন’—এই মন্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তথ্য ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি।
বরং এই ঘটনাটি থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—হোটেল পাঁচতারকা হলেই খাবার নিরাপদ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত পরিদর্শন, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, মেয়াদ যাচাই, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য আলাদা করে রাখা, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি এবং কঠোর ট্রেসেবিলিটি—সবকিছুই নিশ্চিত করতে হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা কোনো দেশের ভাবমূর্তির বিষয়ও
আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুধু কূটনীতি বা রাজনীতির মঞ্চ নয়; এটি একটি দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা, আতিথেয়তা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থারও পরীক্ষা। তাই ব্রিকসের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের আগে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানে কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা অডিট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার, তেলাপোকা কিংবা পচা খাদ্য—এগুলো শুধু একটি হোটেলের সমস্যা নয়; এগুলো খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সতর্ক সংকেত।
সুতরাং প্রশ্নটা শুধু—“প্রধানমন্ত্রী ভারতে গেলেন কি গেলেন না?”—এখানে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশ্ন হওয়া উচিত:
“আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য খাবার পরিবেশনের আগে প্রতিটি হোটেলের খাদ্য নিরাপত্তা কতটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?”
কারণ খাবারের ক্ষেত্রে তারকা যত বেশি হোক, নিরাপত্তার মানদণ্ডে কোনো ছাড় থাকার সুযোগ নেই।
