পোশাক রপ্তানিতে ৭৩ শতাংশই তুলার পণ্য

স্টাফ রিপোর্টার

বিশ্বের পোশাকবাজার দ্রুত ম্যানমেইড ফাইবার বা মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক পণ্যের দিকে ঝুঁকলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনও তুলানির্ভর। বৈশ্বিক ক্রেতাদের চাহিদায় পরিবর্তন, স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাক্টিভওয়্যার ও টেকনিক্যাল পোশাকের বিস্তার এবং পণ্যের বৈচিত্র্যের বাড়তি চাহিদা বাংলাদেশের জন্য কটনের বাইরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। তবে এই পরিবর্তনে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনও ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ কটননির্ভর—যা বিশ্ব গড় ৪১ দশমিক ৬ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি মোট রপ্তানির ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

বিপরীতে, ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ, চীনের ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ ও কম্বোডিয়ার ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ নন-কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবারের। এসব দেশ তুলার পাশাপাশি নন-কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবার পণ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম কটননির্ভর দেশ বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কটননির্ভর কেবল পাকিস্তান ৮৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ভারত ৭৪ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ২০১৬ সালে দেশের পোশাক রপ্তানিতে ম্যান-মেইড ফাইবারের অংশ ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নন-কটন পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ শুরু হয়েছে, এখন প্রয়োজন এ পরিবর্তনের গতি আরও বাড়ানো।

যে কারণে পিছিয়ে বাংলাদেশ
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, পোশাক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও পণ্য উদ্ভাবনের সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় শিল্পটি এখনও মূলত প্রচলিত কটনভিত্তিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের বাজার ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে।

তাদের মতে, এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ম্যান-মেইড ফাইবার ও অন্যান্য নন-কটন পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে হলে সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল ফাইবারের প্রসেসিং, ডাইং ও ফিনিশিং সক্ষমতা বাড়াতে দ্রুত বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নন-কটন কাপড় ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনে দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরিতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, এনার্জি-নির্ভর সিনথেটিক ডাইংয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং নন-কটন উৎপাদন সক্ষমতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর নীতি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এ ক্ষেত্রে যে উদ্যোগ নিয়েছে, বাংলাদেশও তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

 

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কটন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম শক্তি এবং এটি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে না। তবে নন-কটন পণ্যে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে শুধু পরিমাণের প্রতিযোগিতা থেকে মূল্য সংযোজনের প্রতিযোগিতায় যেতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এ ক্ষেত্রে প্রথমে প্রয়োজন সিনথেটিক ও টেকনিক্যাল ফাইবার প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডাইং ও ফিনিশিং সক্ষমতায় দ্রুত বিনিয়োগ। একই সঙ্গে নন-কটন কাপড় ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনে দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরিতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নীতি সহায়তার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নন-কটন ও ম্যান-মেইড ফাইবার পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তার মতে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এখনও কটননির্ভর, অথচ বৈশ্বিক পোশাক বাজারের বড় অংশ ক্রমেই সিনথেটিক ও ম্যান-মেইড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের দিকে যাচ্ছে। ফলে এই বাজারের সুযোগ নিতে না পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নন-কটন খাতে যেতে হলে শুধু পোশাক তৈরির সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; ফাইবার, সুতা ও কাপড়ের প্রসেসিং, ডাইং-ফিনিশিং, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা ও পণ্য উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু ম্যান মেইড ফাইবারের কাঁচামালের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর, তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি সুবিধা ও বিনিয়োগ প্রণোদনার মাধ্যমে শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

 

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কটন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি হলেও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য এর পাশাপাশি নন-কটন পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। তাই শুধু কম খরচে বেশি পণ্য উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *