এপ্রিল মাসের রপ্তানি আয়ে উল্লম্ফন টেকসই না সাময়িক?
এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও তা রপ্তানিকারকদের আস্থা ফেরাতে বা আশাবাদী করে তুলতে পারেনি। এমনকি চলতি আর্থিক বছর ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি মূলত ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির সময় জমে থাকা রপ্তানি আদেশ ও চালান পরে নিষ্পত্তি হওয়ার ফল— বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন নয়।
ফলে সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফনকে স্থায়ী ইতিবাচক ধারা হিসেবে দেখছেন না উদ্যোক্তারা। বরং তারা এটিকে সাময়িক সমন্বয় বলে মনে করছেন। সামনের মাসগুলোতে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মন্তব্য করছেন রপ্তানিকারকরা।
টানা আট মাসের পতনের ধারা ভেঙে চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের রপ্তানি আয়ে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এ মাসে রপ্তানি আয় বছরওয়ারি হিসেবে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের একই মাসে যা ছিল ৩০০ কোটি ডলার।
রোববার (৩ মে) প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট রপ্তানি ৩৯৪ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০২ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফন ইতিবাচক মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা আগামী মাসগুলোতে এই ঘাটতি পূরণের শক্ত সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে কমেছে রপ্তানি আয়। এ সময়ে দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধি টেকসই না সাময়িক
ইপিবির দাবি, এপ্রিলে রপ্তানি আয়ের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক চাহিদা পুনরুদ্ধার এবং দেশের রপ্তানি খাতের স্থিতিস্থাপকতার প্রতিফলন। তবে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন রপ্তানিকারকরা।
তাদের দাবি, মার্চ মাসে দীর্ঘ ছুটির কারণে উৎপাদন ও জাহাজীকরণ ব্যাহত হওয়ায় এপ্রিল মাসে রপ্তানি বেড়েছে। নতুন ক্রয়াদেশে উল্লেখযোগ্য কোনো উল্লম্ফন বা ক্রেতাদের ক্রয় প্রবণতায় পরিবর্তন হয়নি।
ইপিবি তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আট মাসের ধারাবাহিক পতন ভেঙে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার বৈশ্বিক চাহিদার নবোদ্যম এবং দেশের রপ্তানি শিল্পগুলোর স্থিতিস্থাপকতাকে তুলে ধরে।
জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট রপ্তানি ৩৯৪ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০২ কোটি মার্কিন ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফন ইতিবাচক মোড় নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা আগামী মাসগুলোতে এই ঘাটতি পূরণের শক্ত সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রপ্তানি গন্তব্যগুলোতেও উৎসাহব্যঞ্জক প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান বাজার যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যথাক্রমে ৪৩ শতাংশ এবং ২৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ হারে উল্লেখযোগ্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রপ্তানি গন্তব্যের সবগুলোতেই ইতিবাচক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যা বৈশ্বিক চাহিদার বিস্তৃতি এবং বাজার বৈচিত্র্যের প্রতিফলন।
সামগ্রিকভাবে, সাম্প্রতিক রপ্তানি পারফরম্যান্স বাংলাদেশের বাণিজ্য খাতে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার এবং নতুন আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থিতিশীল শিল্পভিত্তি ও সম্প্রসারিত বাজারের ওপর যা নির্ভরশীল।
যদিও ইপিবির এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন রপ্তানিকারকরা। তাদের ব্যাখ্যা ভিন্ন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত এপ্রিল মাসে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, তা মূলত আগের মাসে রপ্তানি কম হওয়ার কারণে হয়েছে।
তিনি বলেন, মার্চ মাসে রপ্তানি কমার প্রধান কারণ ছিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমাদের কারখানাগুলোতে প্রায় ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটি। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং রপ্তানি কম হয়েছে, যার প্রভাব এপ্রিল মাসে এসে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, মার্চ মাসে শিপমেন্ট না হওয়া পণ্য এপ্রিলে শিপমেন্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, রপ্তানির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের জুলাই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, মে মাসে ঈদের প্রভাবের কারণে জুন মাসেও রপ্তানি সাময়িক বাড়তে পারে।
এপ্রিল মাসে রপ্তানি আয়ে যে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা উদযাপনের মতো কিছু নয়; কারণ এটি প্রকৃত পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। এই প্রবৃদ্ধি মূলত সাময়িক। মার্চ মাসে ছুটির কারণে রপ্তানি চালান কম হওয়ায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তারই প্রভাব হিসেবে পরবর্তী মাসে জমে থাকা চালান নিষ্পত্তি হওয়ায় এই উল্লম্ফন দেখা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারখানা মালিক এমন মন্তব্য করেছেন।
তার মতে, শেষ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতেই শেষ হতে পারে চলতি অর্থবছর। তাছাড়া, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না থাকায় আগামী অর্থবছরের প্রথম দুই-তিন মাসেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে, নতুন সরকার মাত্র দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছে। এ অবস্থায় এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ পর্যায়ে থাকায় ক্রেতাদের আস্থাও পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রপ্তানির হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়া মানেই এটিকে প্রকৃত ঘুরে দাঁড়ানো বলা যায় না। কারণ, আগের মাসগুলোর প্রবণতা তেমন কোনো ইঙ্গিত দেয় না।
তিনি বলেন, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘ ছুটির কারণে আগের মাসগুলোতে পণ্যের চালান ধীরগতির ছিল, যা পরবর্তী সময়ে নিষ্পত্তি হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। এটি স্থায়ী উন্নতির প্রতিফলন নয়।
রপ্তানি আয়ের চিত্র
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আয় হয়েছে ৩১ দশমিক ৪০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসের ২৩ দশমিক ৯০ কোটি ডলারের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩১৭ কোটি ডলার। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩২৬ কোটি ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ৮২ শতাংশ কম।
এ সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ১৬৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ কম। এছাড়া ওভেন পোশাক রপ্তানি ১৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এক দশমিক ৮৩ শতাংশ কম।
কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে স্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘ ছুটির কারণে আগের মাসগুলোতে পণ্যের চালান ধীরগতির ছিল, যা পরবর্তী সময়ে নিষ্পত্তি হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। এটি স্থায়ী উন্নতির প্রতিফলন নয়। — বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন
অন্যান্য প্রধান খাতের মধ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানি জুলাই-এপ্রিল সময়ে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমে ৮১ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৮৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
আলোচ্য সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়ে ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে হোম টেক্সটাইল খাতও। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এ খাতের রপ্তানি ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৭৪ কোটি ডলার।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে। জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ খাতের রপ্তানি ২ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ৭০ কোটি ২০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৬৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ৪৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করে এ খাত।
