নতুন চেয়ারম্যান পাচ্ছে বিএসইসি

স্টাফ রিপোর্টার

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদ থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে এরইমধ্যে আইনে সংশোধন এনেছে সরকার। চলতি সপ্তাহেই আইনের সংশোধনীর গেজেট প্রকাশ করার পাশাপাশি বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক ডজন ব্যক্তির নাম জমা পড়েছে। তবে দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন দুজন। এর মধ্যে একজনের অতীতে বিএসইসিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আরেকজনের রয়েছে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিএসইসি থেকে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে চলতি সপ্তাহেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে নতুন চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন তা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওপর নির্ভর করছে। সরকার একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে চায়। সে লক্ষ্যেই কার্যক্রম চলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান একজন বয়স্ক ব্যক্তি হবেন, এটা নিশ্চিত। তিনি কে, তা চলতি সপ্তাহেই জানা যাবে। সরকার অনেক চিন্তাভাবনা করেই তাকে নিয়োগ দিচ্ছেন। সরকার চায় পুঁজিবাজারে গতি আসুক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ুক। পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করে সরকার যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগ করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার না। এটা খুব অল্প সময়ের ব্যাপার। এর আগে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান পদ থেকে এম আসলাম আলম পদত্যাগ করেছেন। বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে, বর্তমান চেয়ারম্যান হয়তো পদত্যাগ করবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে এক ডজনের বেশি নামের তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসেছে। তবে কে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান হবেন, সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। চলতি সপ্তাহেই এটি চূড়ান্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চাচ্ছে দ্রুত বিএসইসিতে পরিবর্তন আনতে।

সংশোধন আনা হয়েছে দুই আইনে
তিনি বলেন, বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি আইডিআরএতেও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে দ্রুত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন এবং বিমা আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিজ্ঞ ও দক্ষ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে যে কোনো বয়সী ব্যক্তিকে এখন বিএসইসি ও আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

অভিজ্ঞ ব্যক্তিই হবেন নতুন চেয়ারম্যান
কে হতে পারেন বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ওপর নির্ভর করছে। তবে আমরা যতটুকু আভাস পাচ্ছি দুজন ব্যক্তির সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। এর মধ্যে একজনের বিএসইসিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং অন্যজনের বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই দুজনের যে কেউ নতুন চেয়ারম্যান হতে পারেন। আবার তাদের দুজনের বাইরে থেকেও নতুন চেয়ারম্যান হতে পারেন। তবে এতটুকু বলা যায়- পুঁজিবাজার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেই নতুন চেয়ারম্যান করা হবে।

বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের অভিমত জানতে পক্ষ থেকে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এতদিন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ অনুযায়ী বিএসইসির চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৫ বছর। অর্থাৎ, ৬৫ বছর পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার বা পদে থাকার যোগ্যতা হারাতেন। অন্যদিকে, আইডিআরএর চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা ছিল ৬৭ বছর।

গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সের সীমা তুলে দিয়ে আইনের সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত ভেটিং সম্পন্ন করে গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সংসদের আইনের সংশোধনী বিল আকারে পাস হয়। এখন এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

সূত্র জানিয়েছে, এই সংশোধনী আনতে বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা গেছে, অনেক দেশেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা নেই। তবে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ কযেকটি দেশে সর্বোচ্চ বয়স সীমা নির্ধারণ করা আছে। এক্ষেত্রে ভারতে সর্বোচ্চ ৬২ বছর, পাকিস্তানে ৬৫ বছর এবং থাইল্যান্ডে ৭০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেয়ারবাজারে গতি বাড়াতে দ্রুত চেয়ারম্যান পরিবর্তন জরুরি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক সদস্য বলেন, শেয়ারবাজারে গতি বাড়াতে দ্রুত বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা উচিত। বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বিএসইসির চেয়ারম্যানের সর্বোচ্চ বয়সী তুলে দিতে আইন যে দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে, তাতে আমরা আশা করছি খুব দ্রুতই বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে একজন সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিকেই সরকার বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান করবেন। যিনি সার্বিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সেই সঙ্গে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব দ্রুত বাজারে কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনবেন এবং দুর্বল কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেবেন না। দ্রুত কয়েকটি ভালো কোম্পানি আনতে পারলে বাজারে গতি ফিরে আসবে।

প্রত্যাশা পুঁজিবাজারের আস্থা ফেরানো
বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। নতুন চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যাশাটা খুব সাধারণ। সেটা হচ্ছে প্রথমে পুঁজিবাজারে আস্থাটা ফিরিয়ে আনতে হবে, যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হবেন না। পুঁজিবাজারের যে পুঁজিটা বিনিয়োগ করা হবে, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা নিরাপদ থাকবে।

তিনি বলেন, লাভ নাও হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগটা নিরাপদ থাকতে হবে। ধরেন একটা ধোকা আইপিও এলো, সেটাতে তো আপনার বিনিয়োগটাই চলে যাবে, লাভ তো দূরের কথা। এই স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা পুঁজিবাজারে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। এটা করতে না পারলে কখনোই ঘুরে দাঁড়াবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *