ঝুঁকিতে রেমিট্যান্স

স্টাফ রিপোর্টার

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের শুরু থেকে অস্থিতিশীল গোটা মধ্যপ্রাচ্য। কমেছে কাজ। চাকরিচ্যুত হচ্ছেন অনেকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ঝুঁকিতে শ্রমবাজার। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন থেকে। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর শ্রমবাজারের অতি নির্ভরশীলতা অনেক সময় বিপদের কারণ। ওই অঞ্চলের অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার কিংবা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে কোনো পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

গত মার্চে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। মাসটিতে পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এছাড়া চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতে এই ধারা বিঘ্নিত হতে পারে।

রেমিট্যান্স পরিস্থিতি নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। একদিকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে তা সাময়িকভাবে বাড়তেও পারে। কোভিডের সময় আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি।-রামরুর চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী
ইতোমধ্যে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে আসেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে, গত ১৫ দিনে দেশে ফেরা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর দেশের শ্রমবাজার
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে শ্রমিক গেছেন ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫ জন। এছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে কাজের উদ্দেশ্যে এই ছয়টি দেশে গেছেন ৩২ লাখ ৮ হাজার ৮৮ জন।

বিএমইটির একটি সূত্র বলছে, এই ছয়টি দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন।

বিগত সরকার ২০২৩ সালে সংসদে জানিয়েছিল বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী থাকেন।

কাজ করছেন প্রবাসী শ্রমিকরা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৬ হাজার ২০৭ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান) থেকে এসেছে ১০ হাজার ৩১৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ হাজার ৩২৮ দশমিক ৮১ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উপসাগরীয় ছয় দেশ থেকে এসেছে ১৩ হাজার ৬৫৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসেছে ২৩ হাজার ৯১২ দশমিক ২২ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ থেকে এসেছে ১১ হাজার ৭৪৭ মিলিয়ন ডলার।

২০২২-২৩ অর্থবছরে এসেছে ২১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ থেকে এসেছে ১১ হাজার ১০৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার প্রায়।

২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছে ২১ হাজার ৩১ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ থেকে এসেছে ১১ হাজার ১১৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার।

মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে দিনমজুর ও নিম্নআয়ের শ্রমিকদের কাজ কমে গেছে। ফলে তাদের পক্ষে নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক নির্মাণ, সেবা ও খুচরা খাতে কাজ করেন। যুদ্ধ বা অস্থিরতার ফলে সাধারণত নতুন প্রকল্প বন্ধ/ধীর হয়ে যেতে পারে, শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে, বেতন বিলম্বিত বা কমে যেতে পারে। এর প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়বে।-অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান
সৌদি আরবে গত ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করছেন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা টিপু সুলতান।  তিনি বলেন, ‘সৌদিতে এত বাঙালি এসে গেছে যে এখানে ভয়াবহ কাজের সংকট। প্রকৃত চিত্র আমরা জানি। মানুষ এসে থাকা-খাওয়ার জায়গা নেই, এজেন্সি আর আত্মীয়স্বজনের ফাঁদে মানুষ চলে আসে। এখন যুদ্ধের কারণে সংকট আরও বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘নিম্ন আয়ের কর্মীরা যারা আগে মাসে কোনোরকম আয়-রোজগার করে দেশে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পাঠাতো, তাদের এখন পাঁচ হাজার টাকা পাঠাতেও কষ্ট হচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে, দেশে ফেরত যাচ্ছে, ইকামা করার টাকা নেই। এভাবে চলছে কর্মীদের জীবন।’

২৫ সালে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স, ২৬ সালে কী হবে
২০২৫ সালে দেশে রেমিট্যান্স আসে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৭–৮ মাসে ২২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে বাকি চার মাস নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি রিসার্চ মুভমেন্টসের (রামরু) চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘রেমিট্যান্স পরিস্থিতি নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। একদিকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে তা সাময়িকভাবে বাড়তেও পারে। কোভিডের সময় আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি।’

প্রবাসী নির্মাণশ্রমিক

তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা। শুধু জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তাই নয়, তাদের চাকরি ও মজুরির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। কোভিডের সময় দেখা যায়, অনেক শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানো হলেও তাদের বকেয়া বেতন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স কমে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি প্রধান চালিকাশক্তি, তাই এর সামান্য ওঠানামাও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান বলেন, ‘চলমান ইরান যুদ্ধের ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি এক চরম সংকটে উপনীত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক নির্মাণ, সেবা ও খুচরা খাতে কাজ করেন। যুদ্ধ বা অস্থিরতার ফলে সাধারণত নতুন প্রকল্প বন্ধ/ধীর হয়ে যেতে পারে, শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে, বেতন বিলম্বিত বা কমে যেতে পারে। এর প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়বে।’

বিকল্প শ্রমবাজার খুবই জরুরি। ইউরোপে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা খুবই সামান্য। শুধু ভাষা শিখিয়ে প্রচুর জনশক্তি রপ্তানি করা সম্ভব জাপানসহ ইউরোপের দেশগুলোতে। আমাদের হাইকমিশনগুলোকে শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নির্ভর হয়ে বেশি বেশি সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।-অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর
তিনি বলেন, ‘এ যুদ্ধের কারণে সম্ভবত বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে এরই মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা আগামীতে কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে।’

অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের কিছু সাময়িক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস বেতন পেতে দেরি হতে পারে। পাশাপাশি তেলের দাম বাড়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা বছরজুড়েই চাপ তৈরি করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া নতুন কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আসতে পারে। ছুটিতে দেশে এসে যারা পুনরায় কর্মস্থলে ফিরবেন, তাদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিলম্বের আশঙ্কা। এসব সংকটের কারণে রেমিট্যান্সে সাময়িক একটা ধাক্কা আসতে পারে। চলতি বছর রেমিট্যান্স কিছুটা কমতে পারে, তবে তা বড় আকারে নয়।’

নতুন শ্রমবাজার খোলার তাগিদ
বিএমইটির তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে গত ছয় বছরে প্রায় ৪২ লাখ শ্রমিক গেলেও ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম ইউরোপ মিলিয়ে ইউরোপের ২৮টি দেশে গেছেন মাত্র ৭৫ হাজার ৬৬৮ জন শ্রমিক। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজার হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বন্দি শ্রমিকরা। এসব কিছুর প্রভাব পড়ে রেমিট্যান্সে।

অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা বেশি থাকলে ঝুঁকি বাড়বে। নতুন শ্রমবাজার (জাপান, ইউরোপ) খুললে রেমিট্যান্স বাড়বে। দক্ষ শ্রমিক বাড়লে বাড়বে মাথাপিছু আয়। এছাড়া ডিজিটাল/ফরমাল চ্যানেল বাড়লে রেমিট্যান্সপ্রবাহ আরও বাড়বে বলে মত বিশ্লেষকদের।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘বিকল্প শ্রমবাজার খুবই জরুরি। ইউরোপে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা খুবই সামান্য। শুধু ভাষা শিখিয়ে প্রচুর জনশক্তি রপ্তানি করা সম্ভব জাপানসহ ইউরোপের দেশগুলোতে। আমাদের হাইকমিশনগুলোকে শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নির্ভর হয়ে বেশি বেশি সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ইউরোপসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এমওইউ পাঠিয়েছি। ইউরোপের দেশগুলো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারা ইতিবাচক সাড়া দিলে শ্রমবাজার খুলতে পারে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, ‘বিদেশ থেকে যারা আসছেন তাদের আমরা সহায়তা করবো। আমাদের ঋণের ব্যবস্থা আছে, যারা ফেরত আসে। এই মাসে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার খোলার জন্য বসা হচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *