বিপাকে আমদানিনির্ভর দেশ

স্টাফ রিপোর্টার

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এশীয় দেশগুলোর মুদ্রার মানে ধস নেমেছে। বিপরীতে জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ দেশগুলোর মুদ্রা শক্তিশালী হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন বৈষম্যের সৃষ্টি করছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার এক মাস পার হলেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। উত্তেজনার কেন্দ্রে আটকা পড়েছে এশিয়ার অর্থনীতি। গত শুক্রবার ফিলিপাইনের মুদ্রা পেসো মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬০ লেভেলে নেমে গেছে। মুদ্রার এ অবমূল্যায়ন ঠেকাতে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরুরি বৈঠক করলেও নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জরুরি বৈঠকের পরও সুদহার না বাড়ানোকে বিনিয়োগকারীরা পেসোর দুর্বলতা মেনে নেয়ার সংকেত হিসেবে দেখছেন। শুধু ফিলিপাইন নয়, দক্ষিণ কোরীয় মুদ্রা ওনের মানও গত এক মাসে প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে, যা গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া থাইল্যান্ডের বাথ গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে এবং জাপানি ইয়েনও গত শুক্রবার প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৬০ অতিক্রম করেছে।

বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে মার্কিন ডলারের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের উচ্চ তারল্যকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের শক্তি পরিমাপক ‘ডলার ইনডেক্স’ প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এশীয় মুদ্রার বিপরীতে নরওয়েজিয়ান ক্রোন, কানাডিয়ান ডলার এবং অস্ট্রেলীয় ডলার বর্তমানে তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার দরপতনের মূলে রয়েছে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতিতে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকলে দ্বিতীয় বছর নাগাদ বিশ্ব প্রবৃদ্ধি আরো দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে ও মূল্যস্ফীতি আরো দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে।

মিজুহো রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিরোমাস মাতসুরা জানান, এশীয় দেশগুলো আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইএএ) তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি বাণিজ্যের ভারসাম্য বর্তমানে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলো ভঙ্গুর অর্থনীতিকে রক্ষা করতে কঠোর মুদ্রানীতি বা সুদহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে ধীরগতি অবলম্বন করছে।

এসএমবিসি নিক্কো সিকিউরিটিজের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ কোতা হিরায়ামা বলেন, ‘অন্যান্য অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেখানে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, সেখানে এশিয়ার দেশগুলোর দোদুল্যমান অবস্থা মুদ্রা বিক্রির চাপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

অন্যদিকে সম্পদশালী দেশগুলো উল্টো পথে হাঁটছে। চলতি মাসের মাঝামাঝিতে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। কানাডাও ২০২৫ সালের পর এই প্রথম সুদহার বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি যুক্তরাজ্যও দীর্ঘদিনের সুদহার কমানোর অবস্থান থেকে সরে এসে তা বাড়ানোর কথা ভাবছে, যা ব্রিটিশ পাউন্ডকে শক্তিশালী করছে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যদি এক বছরের বেশি স্থায়ী হয়, তবে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে উদীয়মান এশিয়ার দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এডিবি আরো জানিয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং মুদ্রানীতি কঠোর করার ফলে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ পর্যটন মূলত মানুষের ‘অতিরিক্ত’ আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যখন জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়, তখন এর প্রভাব পড়ে কয়েকভাবে। যেমন বিলাসবহুল খরচ কমে ও ভ্রমণ খরচ বাড়ে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিমান ভাড়া ও যাতায়াত খরচ একলাফে অনেক বেড়ে যায়। এতে পর্যটননির্ভর দেশগুলো বিদেশী পর্যটক হারায়।

সুমিতোমো মিতসুই ব্যাংকিং করপোরেশনের প্রধান কৌশলবিদ দাইসুকে উনো বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে যে দেশগুলো নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *