অবিশ্বাস্য এক সফর, শেষ মুহূর্তের নাটকীয় টুইস্টে ভরা!
মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে—যেগুলো আগে থেকে পরিকল্পনা করলেও তার শেষটা কেমন হবে, তা জানা থাকে না। ঠিক সিনেমার মতো—গল্প চলতে থাকে, ক্লাইম্যাক্স ঘনিয়ে আসে, কিন্তু শেষ দৃশ্যটা কী হবে, তা বলা যায় না। তবে মাঝেমধ্যে সেই শেষ দৃশ্যটা এতটাই মধুর হয় যে, মনে হয়—কখনো কখনো জীবন আসলে সিনেমাকেও হার মানায়।
গত ৯ অক্টোবর আমাদের অফিসের একটি গ্রুপ ট্যুর ছিলো নেপালের উদ্দেশ্যে। টিকেট কাটা ছিলো অনেক আগেই। দুই সপ্তাহ ধরে সহকর্মীদের নিয়ে বেশ আয়োজনের প্রস্তুতি, চাপা উত্তেজনা। কারণ অনেকেরই জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ কিন্তু ভ্রমণের নির্ধারিত দিনে আমার জন্য এই ট্যুরটি যেন এক “মিশন ইম্পসিবল” হয়ে দাঁড়িয়েছিলো!
কারণ ৯ তারিখ ভ্রমণের দিন সকাল ১১:৩০টা পর্যন্তও আমার হাতে পাসপোর্ট ছিলো না!
জাপান দূতাবাসে ভিসার জন্য জমা দেয়া পাসপোর্ট তখনও দূতাবাসে আটকে। এদিকে হাতে সময় খুবই কম—দুপুর ৩টার ফ্লাইট! পাসপোর্ট দুপুর বারোটা সাড়ে বারোটার মধ্যে হাতে না পেলে সফর নিশ্চিত বাতিল হয়ে যেতে পারে আমার জন্য।
তবুও আমি লাগেজ গুছিয়ে, রেডি হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে পড়ি। মনের ভিতরে ছিলো একরাশ অনিশ্চয়তা আবার তার বিপরীতে দারুণ এক আশা। জানি, পাসপোর্ট না পেলে কিছুই হবে না—তবুও মনে হচ্ছিলো, শেষ মুহূর্তে কোনো এক অলৌকিক ঘটনার আশায় হয়তো কিছু একটা হবে।
এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলো আমার অফিসের সহকর্মীরা, সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের পরামর্শ ও সহানুভূতি ছিলো আশীর্বাদের মতো।
আর সবচেয়ে বড় সহায়তা পেয়েছি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আমার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাইয়ের নিকট থেকে—যিনি তখন অস্ট্রেলিয়ায় অফিসিয়াল কাজে ছিলেন। সেখান থেকে সে আমার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সাহায্যের ব্যবস্থা করেন, যোগাযোগ করে দূতাবাসে জমা থাকা পাসপোর্টটি বের করে আনার ব্যবস্থা করেন।
ঠিক দুপুর ১২টা নাগাদ পাসপোর্ট হাতে পেলাম।
সাথে সাথে গুছিয়ে রাখা ব্যাগ নিয়ে ছুটলাম এয়ারপোর্টের দিকে, যেন কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য! সময় হাতে একেবারেই কম, তবুও মনে হচ্ছিলো—আমি যাচ্ছি, আমি পারবো।
বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি আমার সহকর্মীরা ইতিমধ্যেই চেক-ইন করে ফেলেছে। আমাকে দেখে সবার মধ্যে যে উচ্ছ্বাস, চিৎকার, হাসি-ঠাট্টা, তা কখনো ভুলবো না।
একজন জুনিয়র সহকর্মী তো বলেই ফেললো—
“স্যার, আপনি তো একদম টাইটানিক মুভির সেই নায়ক জ্যাকের মতো! শেষ মুহূর্তে জাহাজে উঠতে পেরেছেন!”
তখন আমার কাছে একটি ডলারও ছিলো না, ক্রেডিট কার্ড এন্ডোর্স করার সুযোগও পাইনি।
তবুও, তখন আমি মনে করছিলাম—আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান, সবচেয়ে ধনী, সবচেয়ে সুখী একজন মানুষ।
১৩ অক্টোবর সমাপ্ত হওয়া এই অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে—
👉 কখনোই আগে থেকেই হেরে যেতে নেই।
👉 সঠিক সময়ে, সঠিক মানুষদের সহায়তা পেলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
👉 জীবন মাঝে মাঝে আমাদের জন্য অভিনব ক্লাইম্যাক্স তৈরি করে—যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে গল্প, শিক্ষা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা।
এই সফর আমার কাছে শুধুমাত্র একটা বিদেশ ভ্রমণ নয়। এটা আমার জীবনের একটা নাটকীয়, শিক্ষণীয় এবং কৃতজ্ঞতায় ভরা অধ্যায়।
সবাইকে হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা—যারা পাশে ছিলেন, দোয়া করেছেন, চেষ্টা করেছেন, এবং আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। 🙏
