খেলাপি ঋণের অর্ধেকই উৎপাদনমুখী শিল্পে

স্টাফ রিপোর্টার

দেশের ব্যাংকখাত এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি। এই খাতে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে খেলাপি ঋণ। এই ঋণ এখন আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় বোঝা। আর ঋণ খেলাপির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চামড়া, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার মতো উৎপাদনমুখী শিল্প।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (২০২৪) অনুযায়ী, দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা এখন খেলাপি। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি খেলাপি ঋণই উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। খেলাপির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকখাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৩ কোটি এবং খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, যা ঋণ বৃদ্ধির প্রায় সমান হারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পখাতেই ঋণের সর্বোচ্চ অংশ মোট ৪৯ দশমিক ২৮ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগজনকভাবে এ খাতেই খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ। যেখানে ২০২৪ সালে মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ এ খাতে হয়েছে। ২০২৩ সালে একই খাতে মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বিতরণ করা হলেও সে সময়েও খেলাপি ঋণের হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ সালে মোট খেলাপি ঋণের ৫৪ দশমিক ৩২ শতাংশ ছিল উৎপাদনমুখী শিল্পখাতে। এ থেকে স্পষ্ট, উৎপাদন খাতে ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণের উচ্চ প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান এবং তা এখন আরও গুরুতর রূপ নিয়েছে।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের চিত্রও একইরকম উদ্বেগজনক
রপ্তানি আয়ের প্রধান অবলম্বন তৈরি পোশাক খাত এখন চরম ঋণ খেলাপির চাপে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এ খাতে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালে একই খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ছিল ২২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ ২৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা বেড়েছে, যা ঋণ বৃদ্ধির চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে এবং খাতটির আর্থিক ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে, বস্ত্র বা টেক্সটাইল খাতের চিত্রও একইরকম উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে টেক্সটাইল খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ খেলাপি। অথচ ২০২৩ সালে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২০১ কোটি এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

চামড়া ও জাহাজ নির্মাণ-ভাঙা শিল্পে ঋণ খেলাপির ভয়াবহ বিস্তার
একসময় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত চামড়া শিল্প এখন নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধ্বংসপ্রায়। ২০২৪ সালে এ খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা এখন খেলাপি। অথচ এক বছর আগে, ২০২৩ সালে, এ খাতে ১৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ২১ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা, যা এ খাতের অস্থিতিশীলতার প্রকট প্রতিচ্ছবি।

অন্যদিকে, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে এ খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যার ৩৯ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। শতাংশের হিসাবে এটিই সব শিল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপির হার। ২০২৩ সালে এ খাতে বিতরণ করা ঋণ ছিল প্রায় ২০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ছিল ৩ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে ৪ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এ খাতও দ্রুত অবনতির পথে।

কৃষিভিত্তিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পখাত
২০২৪ সালে কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ এর আগের বছর ২০২৩ সালে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ কোটি এবং খেলাপি ছিল ৮ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যা এ খাতে অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প (এসএমই) খাতেও ঋণ খেলাপি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৬ হাজার ১৫১ কোটি, যার মধ্যে ১৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা এখন খেলাপি। শতাংশের হিসাবে যা ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ—খুবই উদ্বেগজনক। অথচ এক বছর আগে ২০২৩ সালে একই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৩০৫ কোটি, খেলাপি ছিল মাত্র ৭ হাজার ২৯০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে এসএমই খাতে খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এ খাতটি স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *