ভিত্তিহীন বর্ণনা: রবিউল আউয়ালে বিশেষ নামায এবং দরূদ পাঠের ফযীলত

স্টাফ রিপোর্ট

রবিউল আউয়ালে বিশেষ নামায এবং দরূদ পাঠের ফযীলত

বাজারে প্রচলিত বার চান্দের ফযীলত নামের কিছু পুস্তিকায় রবিউল আউয়াল মাসের আমল শিরোনামের অধীনে লেখা হয়েছে-

এক. “যে ব্যক্তি রবীউল আউয়াল মাসের চাঁদ দেখে সে রাতে দুই দুই রকাত করে ১৬ রাকাত নামায আদায় করে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর তিনবার সূরা ইখলাস পাঠ করবে। আর নামায শেষ করে নি¤েœাক্ত দরূদ শরীফ ১০০০ বার পাঠ করবে। এরূপ একাধারে ১২ দিন পর্যন্ত পাঠ করলে ১২ দিন যেতে না যেতেই সে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নযোগে দেখতে পাবে। দরূদ শরীফটি হল…।”

দুই. “যে ব্যক্তি এ মাসের প্রথম দিন হতে শুরু করে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত প্রত্যহ এশার নামাযের পর নি¤েœাক্ত দরূদ…। …সে ব্যক্তি প্রচুর পরিমাণে ধন-সম্পদের মালিক হবে এবং তার সংসারে সুখ-শান্তি বিরাজ করবে…।”

তিন. “যে ব্যক্তি ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখে বেশি পরিমাণে নফল নামায, কোরআন তেলাওয়াত, যিকির… তার গুনাহ মাফ করে সম্মান বৃদ্ধি করে দেবেন…। ”

চার. “ যে ব্যক্তি এই দরূদ শরীফ সোয়া লক্ষ বার রবিউল আউয়াল মাসের মধ্যে পড়িবে সে…। ”

পাঁচ. “১২ রবিউল আউয়ালে তাবে তাবেয়ীগণ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র রূহের প্রতি হাদিয়া স্বরূপ ২০ রাকাত নফল নামায পড়িতেন। প্রত্যেক রাকাতে…।”

এভাবে বিভিন্ন পুস্তকে রবিউল আউয়াল মাসের আমল হিসাবে বিভিন্ন ধরনের মনগড়া পদ্ধতির নামায ও দরূদ শরীফের আমল এবং তার মনগড়া ফযীলত লেখা হয়েছে। এগুলো সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

সাখাবী রাহ. দরূদ শরীফ বিষয়ক তার কিতাব ‘আলকাওলুল বাদী’-এ সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে বা নির্দিষ্ট মাসে বিশেষ ধরনের নামাযের সাথে সাথে দরূদ পাঠের ফযীলত বিষয়ক কিছু জাল বর্ণনা উল্লেখ করার পর বলেন-

ولم أورد هذه وشبهه إلا للتنبيه على وهائه.

এ বর্ণনাটি এবং এজাতীয় অন্যান্য যে (ভিত্তিহীন) বর্ণনা আমি এখানে উল্লেখ করেছি; তা কেবল এগুলোর অসারতা ও ভিত্তিহীন হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করার উদ্দেশ্যেই। -আলকাওলুল বাদী‘, পৃ. ২৯৮

আর আমাদের আলোচ্য বর্ণনাগুলো এমন ধরনের বানোয়াট কথা যে, জাল বর্ণনা বিষয়ক কিতাবাদিতেও তা পাওয়া যায় না। জাল বর্ণনা বিষয়ক বেশ কিছু কিতাব ঘেঁটেও রবিউল আউয়াল মাস কেন্দ্রিক বিশেষ কোনো নামাযের জাল বর্ণনাও পাওয়া যায়নি। পূর্ববর্তী হাদীস জালকারীরা বছরের অন্যান্য মাস বা দিনের আমল সম্পর্কে হাদীস জাল করেছে, কিন্তু রবিউল আউয়াল মাস বিষয়ে কোনো জাল বর্ণনা পাওয়া যায়নি। কারণ, রবিউল আউয়াল মাস-মুহাররম, রমযান, যিলহজ্ব ইত্যাদি মাসের মত বিশেষ আমলের মাস নয়। আল্লাহই ভালো জানেন, বার চান্দের আমল শিরোনামের পুস্তিকাওয়ালারা এসকল কথা কোথা থেকে পেল; যা তারা ‘কিতাবে উল্লেখ আছে’ বা ‘কিতাবে বর্ণিত আছে’ ইত্যাদি বলে পেশ করেছে।

আর দরূদ শরীফ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও বহুত বড় নেক আমল। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে মুমিনদের দরূদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। এর সবচে বড় ফযীলত হল, দরূদ পাঠকারীর উপর আল্লাহ তাআলা রহমত নাযিল করেন। কেবল রহমতই নাযিল করেন না; একবার দরূদ পাঠ করার কারণে দশবার রহমত নাযিল করেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى الله عَلَيْهِ عَشْرًا.

যে আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৮

এছাড়াও দরূদ পাঠের মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مِنْ أُمَّتِي صَلَاةً مُخْلِصًا مِنْ قَلْبِهِ، صَلَّى الله عَلَيْهِ بِهَا عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَرَفَعَهُ بِهَا عَشْرَ دَرَجَاتٍ، وَكَتَبَ لَهُ بِهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ، وَمَحَا عَنْهُ عَشْرَ سَيِّئَاتٍ.

যে ব্যক্তি আমার প্রতি অন্তর থেকে একবার দরূদ পেশ করবে আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। তার মর্তবা দশ স্তর পর্যন্ত উন্নীত করবেন। তাকে দশটি নেকী দান করবেন এবং তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেবেন। -সুনানে কুবরা, নাসায়ী, হাদীস ৯৮৯২, ৯৮৯৩; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১২৯৭; আমালুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলাহ, নাসায়ী, হাদীস ৩৬২

তেমনি বেশি বেশি দরূদ পাঠের মাধ্যমে নবীজীর নৈকট্য লাভ হয়, ফিরিশতাদের দুআ লাভ হয়। চিন্তা-পেরেশানী দূর হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ القِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلاَةً.

কিয়ামতের দিন আমার নৈকট্য লাভ করবে ঐ ব্যক্তি, যে আমার প্রতি অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৮৪

আমের ইবনে রবীআ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَا صَلّى عَلَيّ أَحَدٌ صَلَاةً، إِلّا صَلّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ مَا دَامَ يُصَلِّي عَلَيّ، فَلْيُقِلّ عَبْدٌ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ.

কোনো ব্যক্তি যতক্ষণ আমার উপর দরূদ পাঠ করতে থাকে ফিরিশতারা তার জন্য দুআ-ইসতিগফার করতে থাকে। এখন ব্যক্তির ইচ্ছা, চাইলে আমার উপর অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করুক অথবা কম। (যে পরিমাণে দরূদ পাঠ করবে সে হিসাবেই ফিরিশতাদের দুআ-ইসতিগফার লাভ করবে।) -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৬৮৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৯০৭; আলমুনতাখাব মিন মুসনাদি আবদ ইবনু হুমাইদ, হাদীস ৩১৭

উবাই ইবনে কা‘ব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, …আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়ে থাকি।… (একপর্যায়ে) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ.

তাহলে তো তোমার (দুনিয়া-আখিরাতের) সকল প্রয়োজন পুরা হবে, সকল পেরেশানী দূর হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১২৪২

আর নির্দিষ্ট দিনে দরূদ পড়ার বিষয়ে সহীহ হাদীসে যা পাওয়া যায় তা হল, জুমার দিন বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা। হযরত আউস ইবনে আউস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إنَّ مِنْ أفضل أيامِكُم يومَ الجُمعة… فأكثروا عَلَيَّ مِن الصَّلاةِ فيه، فإنَّ صَلاتَكم مَعرُوضَةٌ عَلَيَّ…

নিশ্চয়ই জুমার দিন শ্রেষ্ঠতম দিনগুলোর অন্যতম। …সুতরাং সেদিন তোমরা আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পড়। নিশ্চয় তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়। … -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১০৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬১৬২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৯১০

অন্য হাদীসে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

أَكْثِرُوا الصَّلَاةَ عَلَيَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَلَيْلَةَ الْجُمُعَةِ؛ فَمَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى الله عَلَيْهِ عَشْرًا.

তোমরা জুমার রাত ও জুমার দিনে আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ কর। যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশবার রহমত নাযিল করেন। -সুনানে কুবরা, বায়হাকী (৩/২৪৯), হাদীস ৫৯৯৪;; ফাযাইলুল আওকাত, বায়হাকী, হাদীস ২৭৭; আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, ইবনুস সুন্নী, হাদীস ৩৭৯

দরূদ পাঠের ফযীলত বিষয়ক এরকম আরো অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। এসকল সহীহ বর্ণনা এবং সেগুলোতে দরূদের এত বড় বড় ফযীলত বর্ণিত হওয়া সত্ত্বেও একশ্রেণির মানুষ নিজে থেকে আরো বিভিন্ন ফযীলত আবিষ্কার করেছে। আল্লাহ তাদের মাফ করুন এবং আমাদেরকে সহীহটা জেনে আমল করার তাওফীক দান করুন। নবীজীর উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ এবং তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে তাঁর শাফাআত লাভে ধন্য করুন- আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *