বাজারে নেতৃত্বে চার শিল্প গ্রুপ ভোজ্যতেলের

স্টাফ রিপোর্ট

দেশে ভোজ্যতেলের বাজার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে প্রধানত পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে পাম অয়েল পরিশোধিত অবস্থায় এনে বাজারজাত হচ্ছে। অন্যদিকে সয়াবিন তেল অপরিশোধিত (ক্রুড) অবস্থায় এনে দেশে পরিশোধন করে তারপর বাজারজাত করছেন উদ্যোক্তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা এ ভোজ্যতেলের বাজারে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে টি কে গ্রুপ, সিটি, এস আলম ও মেঘনা গ্রুপ—এ চার করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে টিকে গ্রুপ রয়েছে শীর্ষস্থানে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল আমদানি শুল্কায়ন বিবেচনায় নিলে গত এক বছরে ভোজ্যতেল আমদানির ৯০ শতাংশই এ তিন প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয়েছে।

ভোজ্যতেল বাজারের সিংহভাগ পাম অয়েলের দখলে থাকলেও বাসাবাড়িতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের চাহিদাই বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হচ্ছে প্রধানত বাণিজ্যিক ও শিল্প সুবিধার ভিত্তিতে। এর মধ্যে শিল্প খাতে দেয়া সুবিধা ভোগ করছে দেশের শীর্ষ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতেই কর পরিশোধ না করে ট্যাংকে রাখা তেল খালাসের সময় ধাপে ধাপে পরিশোধের সুযোগ পায়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুবিধায় আমদানি হওয়া ১৮ লাখ ২১ হাজার টন (পরিশোধিত ও অপরিশোধিত) ভোজ্যতেলের শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর মূল্য ১১ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এসব ভোজ্যতেলের শুল্কায়ন হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুবিধা নিয়ে আমদানি হওয়া ৭ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা মূল্যের ১৫ লাখ ১৬ হাজার টন ভোজ্যতেলের শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

এনবিআরের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত আকারে আমদানি হয়। অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা ভোজ্যতেল স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের পর বাজারজাত করা হয়। দেশের বাজারে ব্যবহার ও আমদানির বেশি হয় প্রধানত পাম অয়েল। তবে গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি শুল্কায়ন হয়েছে ১১ লাখ ৫২ হাজার ৩৫১ টন পরিশোধিত (রিফাইন্ড) পাম অয়েলের। এর পরই রয়েছে অপরিশোধিত (ক্রুড) সয়াবিন ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩২২ টন।

গত এক বছরে (২০২০ সাল) ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুবিধা নিয়ে ৬ লাখ ৮৭ হাজার টন ভোজ্যতেল শুল্কায়ন করে এ তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে টি কে গ্রুপ। স্থানীয় বাজারে পুষ্টি ব্র্যান্ড নামে ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। গত এক বছরে টি কে গ্রুপের আমদানীকৃত সয়াবিন তেল শুল্কায়ন হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার টন, যার মোট মূল্য ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে শুল্কায়ন হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের ৪ লাখ ৩৫ হাজার টন পরিশোধিত পাম অয়েল।

টি কে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে ভোজ্যতেলের আমদানি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। আমাদের হিসাবে বছরে ভোজ্যতেলের আমদানি সয়াবিন ও পাম মিলে ২৮ লাখ টন পর্যন্ত হওয়ার কথা। প্রতি বছরই এর চাহিদা বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে আমদানিও বাড়ছে।

এনবিআরের হিসাব বলছে, গত এক বছরে শিল্প সুবিধায় শুল্কায়ন হওয়া সিটি গ্রুপের আমদানীকৃত ভোজ্যতেলের পরিমাণ ৩ লাখ ৫৩ হাজার টন। দেশের বাজারে তীর ও সান ব্র্যান্ডের মোড়কে ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। সিটি গ্রুপের আমদানীকৃত ভোজ্যতেলের ১ লাখ ৪৫ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর মূল্য ৯৪৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। একই সময়ে শুল্কায়ন হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার টন পরিশোধিত পাম অয়েল, যার মূল্য ১ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা এ প্রসঙ্গে বলেন, ভোজ্যতেলের বাজার ধাপে ধাপে বড় হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে থাকায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত এর প্রবৃদ্ধি রয়েছে। দেশে ভোজ্যতেল আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশই করছে সিটি গ্রুপ।

গত এক বছরে এস আলম গ্রুপের আমদানীকৃত ভোজ্যতেল শুল্কায়ন হয়েছে ৩ লাখ ৪১ হাজার টন। এর মধ্যে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল রয়েছে ৭১ হাজার ৯০০ টন। এর মূল্য ৪৮৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে পরিশোধিত পাম অয়েল শুল্কায়ন হয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার টন, যার মূল্য ১ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা।

এস আলম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সালাহউদ্দিন বলেন, দেশে প্রতি বছরই ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে আমরাও পাম অয়েল ও সয়াবিনের আমদানি বাড়াচ্ছি।

গত এক বছরে মেঘনা গ্রুপের আমদানীকৃত ভোজ্যতেল শুল্কায়ন হয়েছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৪৯০ টন। ফ্রেশ ব্র্যান্ডের মোড়কে ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। মেঘনা গ্রুপের আমদানি হওয়া তেলের মধ্যে ২৬৭ কোটি টাকা মূল্যের ৪৪ হাজার ৭০০ টন অপরিশোধিত সয়াবিন এবং ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা মূল্যের ২ লাখ ৩৮ হাজার টন পরিশোধিত পাম অয়েল রয়েছে।

বাজারে রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেল সরবরাহ করছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় পাঁচ বছর আগে মোংলায় অবস্থিত সিঙ্গাপুরের সুন সিং গ্রুপের ভোজ্যতেল পরিশোধনাগার ক্রয় করে। গত এক বছরে বাংলাদেশ এডিবলের আমদানীকৃত ৯৫৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা মূল্যের ১ লাখ ৪৭ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি কোনো পাম অয়েল আমদানি করেনি।

এই এক বছরে ইউনাইটেড গ্রুপের আমদানীকৃত অপরিশোধিত সয়াবিন তেল শুল্কায়ন হয়েছে ৮ হাজার ৫০০ টন, যার মূল্য দাঁড়ায় ৫৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

এদিকে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য ধারাবাহিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো বলছে, ভোজ্যতেল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) একাধিক স্তরের হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের আমদানি মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাটের চাপও বেশি পড়ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট থেকে ভোজ্যতেলের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ শুরু হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে ওই দামের ওপর ভিত্তি করে ভ্যাট ও কর আদায় করলে স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়ে।

এ অবস্থায় ভোজ্যতেল আমদানিতে ট্যারিফ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়ে তার ভিত্তিতে ভ্যাট আদায় করার একটি প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আমদানি মূল্যের ওপর ভ্যাট আরোপের পরিবর্তে টনপ্রতি দাম নির্দিষ্ট করে দিয়ে ওই দামের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা প্রয়োজন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও করের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকবে। এতে করে ভোক্তাদের অতিরিক্ত করের বোঝা টানতে হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *