রুগ্ণ থেকে উত্তম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর হয়েছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন

স্টাফ রিপোর্ট

একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংককে তুলনা করা হতো বহুজাতিক জায়ান্ট স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সঙ্গে। মাত্র কয়েক বছরের লুণ্ঠনে সব অর্জন বিসর্জন দিয়েছে ব্যাংকটি। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও তথৈবচ।

তবে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। দুই দশক ধরে ক্রমান্বয়ে আলোর পথে হেঁটেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মতোই খেলাপি ঋণের ভারে বিধ্বস্ত ছিল হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। ২০০১ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৫ শতাংশের বেশি। অথচ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের হার ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের গড় খেলাপি ঋণের হারের চেয়েও কম। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রেখেই ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা যেমন বেড়েছে, তেমনি ঋণ নিয়ে ঘর নির্মাণ করার সুযোগ পেয়েছে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে ঋণ বিতরণ ও আদায়ে স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে ঋণশৃঙ্খলা ছিল না। কিন্তু গত এক দশকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঋণ বিতরণে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার কমে এসেছে। একই সঙ্গে অতীতের তুলনায় বেশি গ্রাহককে ঋণ দিতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অরুণ কুমার চৌধুরী বলেন, সরকার প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো করার পাশাপাশি সম্প্রসারণ চাচ্ছে। সরকারের এ প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বছরের শুরুতে বার্ষিক কর্ম সম্পাদন চুক্তি হচ্ছে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। পাশাপাশি কর্মীদের মধ্যেও ভালো কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। ফলে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে।

মানুষের মৌলিক পাঁচটি চাহিদার একটি হলো বাসস্থান। জনসাধারণের মৌলিক এ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই ১৯৫২ সালে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে পুনর্গঠিত হয় বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি)। প্রতিষ্ঠানটির দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত ৮৪ হাজার ২৩৭ জন গ্রাহককে গৃহ বা ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য ঋণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিতরণ করা হয়েছে মোট ৭ হাজার ১৪৭ কোটি টাকার ঋণ। এসব ঋণের মাধ্যমে মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৬৭৬টি ইউনিট (বাড়ি-ফ্ল্যাট) তৈরি হয়েছে। কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ও আদায় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

দুই দশক আগে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ঋণ আদায়ের হার ছিল ৪০ শতাংশের ঘরে। অথচ সর্বশেষ পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ আদায় হয়েছে ৯০ শতাংশের বেশি। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরেও হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ঋণ আদায় হয়েছে ৯২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫৭ কোটি টাকা ছিল খেলাপি ঋণ, যা বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।

নিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণের ফলে কয়েক বছর ধরে ভালো পরিচালন ও নিট মুনাফা পাচ্ছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফা পেয়েছে ১০৬ কোটি টাকা। কর ও সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর ৮৬ কোটি টাকা নিট মুনাফায় নিতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে বিএইচবিএফসি। অর্থবছরটিতে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফা পেয়েছে ১৭০ কোটি টাকা। বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে মহামারীর মধ্যেও ১৬৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিও নিয়ে বিশাল অংকের এ মুনাফা অর্জনকে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্সের বড় সফলতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিশাল অংকের ব্যালান্সশিট নিয়েও আর্থিক বিপর্যয়ে ধুঁকছে।

ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুণ কুমার চৌধুরীর ভাষ্য হলো, হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন সর্বনিম্ন সুদে গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ঋণের সুদহার হলো ৯ শতাংশ, যা ২০১৭ সাল থেকেই কার্যকর হয়েছে। দেশের অন্য এলাকায় মাত্র ৮ শতাংশ সুদে আমরা গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছি। স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ায় গ্রাহকরা উপকৃত হচ্ছেন।

হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন বাণিজ্যিক কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয় না। প্রতিষ্ঠানটি থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ঋণ নিতে পারেন গ্রাহকরা। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের কর্মীদের বক্তব্য হলো পাঁচ দশকে প্রতিষ্ঠানটি যতটুকু সম্প্রসারিত হতে পারত, ততটুকু হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল। ফলে দীর্ঘ এ পথযাত্রায় যে পরিমাণ মানুষকে সেবা দেয়া সম্ভব ছিল, তা হয়নি। বর্তমানে সারা দেশে ৬১টি শাখার মাধ্যমে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের কার্যক্রম চলছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও বিস্তৃতি বাড়ানো সম্ভব হলে আরো বেশি পরিমাণ মানুষকে আবাসন সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।

১১টি প্রডাক্টের মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স। প্রডাক্টগুলো হলো আবাসন মেরামত, আবাসন উন্নয়ন, কৃষক আবাস ঋণ, ফ্ল্যাট ঋণ, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন ঋণ, পল্লীমা, নগরবন্ধু, সরকারি কর্মচারীদের জন্য গৃহনির্মাণ ও ফ্ল্যাট ঋণ, হাউজিং ইকুইপমেন্ট ঋণ, শূন্য ইকুইটি ঋণ ও প্রবাস বন্ধু। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে শূন্য ইকুইটি ঋণ চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রায় তিন বছর ধরে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম উদ্দিন। তিনি বলেন, দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আবাসন চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি সূচকে উন্নতি করেছে। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও করপোরেট সুশাসনের ফলে যোগ্য ব্যক্তিই ঋণ পাচ্ছেন। পাশাপাশি ঋণ মনিটরিংয়ে জোর দেয়ায় গ্রাহকরা যথাসময়ে ঋণ ফেরত দিচ্ছেন। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের বিতরণকৃত ঋণের আকার আরো বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের আরো বেশি জনগোষ্ঠী আবাসন সুবিধার আওতায় আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *