এনআরবি ব্যাংক পর্ষদে বিরোধ বাড়ছেই, উচ্চ আদালতে তিন আরো চার মামলার প্রক্রিয়া চলছে

দুই বছর ধরে বিরোধ চলছে এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ থেকে যে বিরোধের সূত্রপাত, তা দিনদিন বেড়েই চলেছে। কয়েক দফায় সমঝোতার উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বিরোধ মেটেনি। উল্টো বিরোধের তীব্রতা বাড়ায় তা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এরই মধ্যে উচ্চ আদালতে তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আরো চারটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যাংকটির পরিচালকরা।

আগামী ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে এনআরবি ব্যাংকের সপ্তম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)। এ সভাকে ঘিরে ব্যাংকটির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিরোধের তীব্রতা আরো বেড়েছে। পরিচালকদের একাংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও গত পাঁচ বছর এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ধরে রেখেছেন মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান (নাসির)। তিনি চাচ্ছেন, আবারো চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হতে। এজন্য প্রতিপক্ষকে ঠেকিয়ে রাখতে সম্ভাব্য সব চেষ্টাই করছেন তিনি। অন্যদিকে বিরোধীরাও সংগঠিত হচ্ছেন এজিএমে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিতে। চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা এনে পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চান তারা।

চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ২০১২ সালে লাইসেন্স পেয়েছিল এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির ৪৬ জন উদ্যোক্তার সবাই প্রবাসী। প্রাথমিক ঘোষণা অনুযায়ী এনআরবি ব্যাংকের সপ্তম এজিএম হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দুই দফায় পেছানোর পর ২৩ ডিসেম্বর এজিএমের তারিখ চূড়ান্ত হয়। এজিএমে অংশ নিতে এরই মধ্যে দেশে আসতে শুরু করেছেন এনআরবি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা।

গত সপ্তাহেই যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেছেন এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ (ওবিই)। তিনি বলেন, এনআরবি ব্যাংক হলো প্রবাসীদের স্বপ্ন। দুষ্ট লোকদের খপ্পরে পড়ে এরই মধ্যে আমাদের স্বপ্নের মৃত্যু হতে চলেছে। এজন্য মহামারীর মধ্যেও দেশে আসতে হয়েছে। আমরা চেয়েছিলাম এনআরবি ব্যাংকের পর্ষদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলুক। কিন্তু মাহতাবুর রহমান কোনোভাবেই ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ ছাড়তে চাচ্ছেন না। দেশের অনেক ব্যাংকই একক ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে জিম্মি হয়ে গেছে। মাহতাবুর রহমানও চাচ্ছেন এনআরবি ব্যাংককে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে। ব্যাংকটিকে বাঁচাতে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলাম। লিখিত অভিযোগ দিয়েও আমরা এখনো কোনো প্রতিকার পাইনি। এজন্য বাধ্য হয়ে বিনিয়োগকারীরা আদালতে যাচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের বড় অংশই ব্যাংকটিকে বাঁচাতে চায়।

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। সেলফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এনআরবি ব্যাংকের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের ১০৯ ধারা অনুযায়ী ব্যাংকটির যে কোনো শেয়ারহোল্ডার পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। সে হিসেবে গত ১৩ অক্টোবর ব্যাংকটির পরিচালক হতে সাতজন বিনিয়োগকারী প্রার্থী হন। কিন্তু কয়েক দফায় এজিএমের তারিখ পেছানোয় প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জন গত ১৫ অক্টোবর নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। এ ছয় উদ্যোক্তাই এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের বিরোধী হিসেবে পরিচিত। তারা হলেন রবিন পাল, মেজবাহ আবু সাদাত, আবু তাহের মোহাম্মদ আমানুল্লাহ, নসরাত খলীল চৌধুরী, আমিনুর রশিদ খান ও পরিচালক পদে পুনর্নির্বাচিত কামাল আহমেদ।

প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা একাধিক উদ্যোক্তা বলেন, ব্যাংকের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের বিধান অনুযায়ী এজিএমের নির্ধারিত তারিখের সাতদিন আগে পরিচালক হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার কথা। এ বিবেচনায় এজিএম পেছানোয় তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তার অনুগত পরিচালকরা ষড়যন্ত্র করে নিজেদের পছন্দের ছয়জন বিনিয়োগকারীকে প্রার্থী করে দিয়েছেন। এজিএমে শেয়ারহোল্ডারদের ভোটে হেরে যাওয়ার ভয়েই চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমান এমনটি করেছেন।

এদিকে আইন অনুযায়ী এজিএমে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করেছেন ব্যাংকটির তিন শেয়ারহোল্ডার আবু তাহের মোহাম্মদ আমানুল্লাহ (ফোলিও নং-৪৪), নসরাত খলীল চৌধুরী (ফোলিও নং-৫২) ও আমিনুর রশিদ খান (ফোলিও নং-৫৪)। হাইকোর্টের বিচারক মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের কোম্পানি বেঞ্চে মামলাটি দায়ের করা হয়। এ মামলার শুনানি শেষে বিচারক আবেদনকারীদের পক্ষে আদেশ দিয়েছেন।

বাদী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাজেদ সামি আহাম্মেদ বলেন, এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের আইনগত অধিকার ক্ষুণ্ন করে প্রার্থী হওয়ার পথই রুদ্ধ করে দিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা কয়েক দফায় ব্যাংকটির চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদকে চিঠি দিয়ে নিজেদের দাবির কথা জানিয়েছিলেন। তার পরও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেয়ায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে আমি এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যাংকটির নির্বাচন কমিশনকে লিগ্যাল নোটিস দেই। নোটিসের কোনো জবাব না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। গত বৃহস্পতিবার আদালত মামলার শুনানি করে আবেদনকারীদের পক্ষে আদেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, ২৩ ডিসেম্বর এনআরবি ব্যাংকের এজিএমের সাতদিন আগে ব্যাংকটির যেকোনো শেয়ারহোল্ডার প্রার্থী হতে পারবেন। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যাংকটির প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, এনআরবি ব্যাংকের সাতজন উদ্যোক্তা পরিচালক চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের বিরুদ্ধে ১১ দফা অভিযোগ তুলে গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল নীতিমালা লঙ্ঘন করে চেয়ারম্যান কর্তৃক ব্যাংকে পারিবারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জোর করে ছুটিতে পাঠানো, ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির ক্ষমতা খর্ব করা, গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা, ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে রাখা, ব্যাংককে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা। লিখিত ওই আবেদনে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫ ও ৪৯ ধারা অনুযায়ী এনআরবি ব্যাংকে হস্তক্ষেপের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়। এ দুটি ধারায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন, অনিয়ম উদ্ঘাটনে বিশেষ পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিধান রয়েছে।

চেয়ারম্যান মাহতাবুর রহমানের পাশাপাশি এনআরবি ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান থাতেইয়ামা কবিরের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তোলেন সাত পরিচালক। নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনি নিয়মিত ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে বসে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিটি কাজে হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগকারীরা হলেন এনআরবি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ (ওবিই), নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ড. নাসের আহমেদ চৌধুরী, ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ, অডিট কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নাভেদ রশিদ খান, পরিচালক মোহা. ইদ্রিস ফরায়েজি এবং বিকল্প পরিচালক আমিনুর রশিদ খান।

পরিচালকদের লিখিত অভিযোগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত দলটি কার্যক্রম শুরু করলেও এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে এনআরবি ব্যাংকের নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান বলেন, ব্যাংকের স্বার্থে আমরা কয়েক দফায় চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ ছাড়ের বিষয়ে রাজিও হয়েছিলেন। পর্ষদের সর্বসম্মত মত ছিল, এক ব্যক্তি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর দুই বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। একই সঙ্গে পরবর্তী তিন বছর তিনি চেয়ারম্যান পদে পুনর্নির্বাচিত হতে পারবেন না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাহতাবুর রহমান চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান পুরো পর্ষদের সঙ্গে প্রতারণা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানিয়েছেন, আমরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে নিজেদের অভিযোগ প্রত্যাহার করেছি। এখন এনআরবি ব্যাংক বাঁচাতে বেশির ভাগ উদ্যোক্তাই এক হয়েছেন। ব্যাংক বাঁচাতে হলে বর্তমান পর্ষদকে অবশ্যই পুনর্গঠন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *