স্টাফ রিপোর্টার »

ইজারা ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে কুষ্টিয়ার ২১টি বালুমহাল দখলে রেখেছে প্রভাবশালী চক্র। এ কারণে সরকার প্রায় ৪শ কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অস্তিত্বহীন এক মামলাবাজের চক্রান্তে কয়েক বছর ধরে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়ে আসছে। আর শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী চক্রটি।

এই বালু মহালের সঙ্গে সরকারদলীয় প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা সরাসরি জড়িত থাকার কারণে আইনগত জটিলতার উছিলা দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ১০ বছর ধরে এসব বালুমহাল ইজারা দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজস্ব বিভাগ বলছে, সঠিকভাবে ইজারা দিতে পারলে ১০ বছরে জেলার ২১ বালুমহাল থেকে ৩শ থেকে ৪শ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া যেত। কিন্তু আইনগত জটিলতা থাকায় তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।

তবে এরই মধ্যে কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে জেলার রাজস্ব বিভাগ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় এক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের দুই নেতার কাছে ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে নোটিশ দিয়েছে স্থানীয় রাজস্ব বিভাগ। গত ৭ অক্টোবর জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব এবং রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর সাদিয়া জেরিন স্বাক্ষরিত নোটিশে ১০ দিনের মধ্যে তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জেলার ২১টি বালুমহাল থেকে প্রতিদিন অন্তত ৩ লাখ ঘনফিট মোটা বালু উত্তোলন করা হয়। যার আর্থিক মূল্য ন্যূনতম (প্রতি ঘনফুট ৩০-৪০টাকা হিসেবে) প্রায় কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হলেও এ খাত থেকে কোনো রাজস্বই পাচ্ছে না সরকার।

নাম সর্বস্ব অস্তিত্বহীন মামলাবাজ চক্রের সৃষ্ট আইনি জটিলতা জিইয়ে রেখে টোলের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও জেলার রাজস্ব বিভাগের প্রাপ্তি শূন্য।

উচ্চ আদালতের এসব মামলা পরিচালনায় ভূমি মন্ত্রণালয় নিযুক্ত কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোসাম্মৎ মোরশেদা পারভিন জানান, কুষ্টিয়া জেলার ৬টি উপজেলাধীন ২১টি বালুমহালের মধ্যে ১১টি মৌজার বালুমহালের ওপর ২০১০ সালে রিট পিটিশন করার মাধ্যমে আনোয়ারুল হক মাসুম নামে এক ব্যক্তি এসব মামলার সূত্রপাত ঘটান।

এরপর ক্রমানুসারে ২০১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ সালের মধ্যে সবকটি বালুমহালের ওপর মামলার সূত্রপাত ঘটান। সরকারের পক্ষে এসব মামলাগুলো মোকাবিলা করে ৮টি মামলা ভ্যাকেট করলেও পুনরায় ২০১৯ সালে মামলার বাদী রিট পিটিশন দাখিল করেন যা এখনও বিচারাধীন।

অবশিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে অধিকাংশ মামলার রিট অনেক আগেই ইনভ্যালিড বা অকার্যকর হয়ে গেছে। এসব বালুমহালগুলো সরকার চাইলে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে ইজারার বন্দোবস্তা করতে পারে বলেও জানান এই আইনজীবী।

জেলার ২১টি বালুমহালকে মামলা জটিলতায় আটকে রেখে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারিগর আনোয়ারুল হক মাসুমের লেটার হেড প্যাডে ব্যবহৃত ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় নেই বলে নিশ্চিত করেন ৬নং পৌর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বদরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই নাম ঠিকানা ভুয়া এবং অস্তিত্বহীন।

জেলার রাজস্ব শাখার নোটিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ১০ বছর যাবত সরকার ঘোষিত কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মজমপুর, বোয়ালদাহ ও হাটশহরিপুর মৌজার বালুমহাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি কোষাগারে কোনো অর্থ জমা দেয়া হচ্ছে না। এতে সরকারের ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৩ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। যা বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক নোটিশ প্রাপ্তির ১০ দিনের মধ্যে ৭ জনকে ক্ষতিপূরণের টাকার সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।

এরা হলেন- কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশহরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শম্পা মাহমুদ, হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মিলন মন্ডল ও সাধারণ সম্পাদক হাজী আরিফসহ আরও ৪জন।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দিলে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও নোটিশে কঠোরভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শম্পা মাহমুদ বলেন, আমরা এখন ক্ষমতায় আছি, তাই অনেকেই আমাদের নাম বলেন। বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। হয়রানি করতে আমাকে এমন চিঠি দেয়া হয়েছে।

মিরপুর উপজেলার রানাখড়িয়া বালিঘাটের ব্যবসায়ী ওহিদুল কবিরাজ বলেন, পশ্চিম বাহিরচর ও রানাখড়িয়া-তালবাড়িয়া বালুঘাটে পদ্মা নদী থেকে প্রতিদিন নির্মাণ কাজের সর্বোচ্চ মানসম্মত প্রায় ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন ও সরবরাহ হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২০ জেলায়। যার আর্থিক মূল্য প্রায় কোটি টাকা।

ভেড়ামারা বারোমাইল বালুঘাটের ব্যবসায়ী মাহবুল হক বলছেন, ঘাট মালিকদের মাধ্যমে আদায়কৃত সরকারি টোল দিয়েই ব্যবসা করি। আদায়কৃত এই টাকা আদৌ সরকারের ঘরে যাচ্ছে কিনা সেটা আমি বলতে পারব না।

বাল্কহেডের মালিক সাহাবুল ইসলামের অভিযোগ, সরকারিভাবে বালুমহাল ইজারা কার্যক্রম বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা অবৈধভারা প্রতিদিন কেবলমাত্র বাহিরচর বারোমাইল ও ঘোড়ামারা তালবাড়িয়া বালুঘাটের অন্তত ৫শ নৌকা থেকে গড়ে ৫০ লাখ টাকা বিনা রশিদে চাঁদা হিসেবে আদায় করছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে মুখ খোলা যাবে না। ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস ও পুলিশ সবাই জানে এখানে কী হচ্ছে।

প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়ে বৈধভাবে ইজারা দিলে সরকার রাজস্ব পেতো, আবার রেট বেঁধে দিলে আমরাও নির্ধারিত টোল দিয়ে ব্যবসা করতে পারতাম।

ঘোড়ামারা-তালবাড়িয়া-রানাখড়িয়া বালিঘাট মালিক ইউপি চেয়ারম্যান হান্নান মন্ডল বলেন, কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন থেকে ৬ কোটি টাকা দিয়ে আমি জুগিয়া-তালবাড়িয়া ধুলটমহল ইজারা নিয়েছি। এ সময় ধুলট মহলের ইজারাদার বালুমহালের টোল নিচ্ছেন কিভাবে এমন প্রশ্নের মুখে তিনি অসংলগ্ন কথা বলেন। তবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

কুষ্টিয়া সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট এএসএম আকতারুজ্জামান মাসুম জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ঠিকানা অস্তিত্বহীন মামলাবাজ আনোয়ারুল হক মাসুম রিট পিটিশন করে বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রেখে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার কোটি টাকা। সেই সঙ্গে সরকারের ৩ থেকে ৪শ কোটি টাকার রাজস্ব গায়েব করে দিয়েছেন।

কুষ্টিয়া জেলা জাসদের সভাপতি হাজি গোলাম মহসিন এবং সনাক কুষ্টিয়ার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম টুকু অভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ঠিকানা অস্তিত্বহীন মামলাবাজ দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ৩-৪শ কোটি টাকা রাজস্ব কুক্ষিগত করলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিভাবে এটা মেনে নিচ্ছে তা বোধগম্য নয়। এতে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে যে সৃষ্ট এই আইনি জটিলতা জিইয়ে রাখার সঙ্গে প্রশাসনেরর কারো কারো যোগসাজশ থাকতে পারে। অন্যথায় এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওবাইদুর রহমান জানান, জেলার ২১টি বালুমহালে আইনগত জটিলতা বিদ্যমান থাকায় দীর্ঘ ১০ বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪শ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে আইনজীবী নিযুক্ত করা হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে আইনি লড়াই করে যখনই কোনো বালুমহাল ভ্যাকেট করা হয় তখনই আবার নতুনভাবে রিট পিটিশন করে ওই চক্রটি দিনের পর দিন এই জটিলতা সৃষ্টি করে চলেছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, আইনগত জটিলতা থাকায় দীর্ঘদিন বালুমহালগুলো ইজারা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি নিরসন করে খুব শিগগিরই সরকারি রাজস্ব আয় নিশ্চিত করতে পারব বলে আশা করছি। সেভাবেই আমরা এগুচ্ছি।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »