স্টাফ রিপোর্টার »

ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার রোমাঞ্চকর কাহিনী রূপকথাকেও হার মানায়। তার অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের কাহিনী লোকগাথা হয়ে ফিরত বাংলার ঘরে ঘরে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অসহায় শিকার হয়েছিলেন এই বংশের মেজোকুমার রাজা রমেন্দ্রনারায়ণ রায়। কথিত মৃত্যুর ১২ বছর পর তিনি সন্ন্যাসী বেশে ফিরে আসেন রাজবাড়িতে। ব্রিটিশের আদালতে আর সংবাদপত্র জগতে ভাওয়াল সন্ন্যাসী নামে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন। সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী তুলে এনেছেন- গাজীপুর প্রতিনিধি।

কিংবদন্তি ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজা

ফজল গাজীর গাজীপুর ও ভাওয়াল রাজার শাসন।পূর্ববঙ্গের ভাওয়াল পরগণা বিস্তৃত ছিল ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার ৬০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে। সেন বংশের পতনের পর ভাওয়ালে বারভূঁইয়ার অন্যতম ফজল গাজী রাজবাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। এই গাজী বংশের একজন তার জমিদারি যে তিনজনের কাছে দান করে দেন তাদের একজন ছিলেন ব্রাক্ষণ। এই ব্রাক্ষণই ভাওয়াল বংশের প্রতিষ্ঠাতা, বাকি দুজন কায়স্থ ছিলেন তারা বলধা ও পূবাইল নামক এলাকায় দুটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলের পর সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রথম ৬ বছরের রাজত্বে এই বাংলার স্বাধীনতার জন্য মোগল সেনাপতিদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যারা লড়েছিলেন ভাওয়াল পরগণার ফজল গাজী ও তার বংশধর বাহাদুর গাজী ছিলেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি নাম। গাজী বংশের প্রতাপ ছিল ঈর্ষণীয়, বর্তমান গাজীপুর নামটিও গাজী বংশের দেওয়া। বর্তমান জয়দেবপুর হতে ১৬ মাইল দূরে মাধবপুরে ফজল গাজী বাস করতেন এবং তিনিই মাধবপুরের নাম পরিবর্তন করে গাজীবাড়ি রাখেন। পরবর্তীতে দৌলত গাজী ঢাকার নবাবদের সঙ্গে রাজ্যের সীমানাসংক্রান্ত বিরোধ মামলায় কুশধ্বজ রায় নামক এক উকিলের সহায়তায় জয়ী হন।

আর এই কুশধ্বজ রায় ভাওয়াল রাজাদের ইতিহাসে প্রথম পুরুষ। এক সময় দৌলত গাজী কুশধ্বজ রায়কে দেওয়ানি পদে নিযুক্ত করেন এবং জয়দেবপুরের চান্দনা গ্রামে একটি বাড়ি ও কিছু জমি দান করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর পুত্র বলরাম রায় বিভিন্ন চক্রান্তের শিকার হন। তার বড় অঙ্কের খাজনা বাকি পড়ে যায়। উপায়ন্তর না পেয়ে বলরাম দৌলত গাজীর বিভিন্ন কর্মচারীর কাছে জমিদারি বিক্রয় করে দেন এবং কৌশলে পালসোনা ঘোষ বংশের নামে তিনি নিজেই দুই আনি জমিদারি ক্রয় করেন। এই জমিদারি পালসোনা বংশের জয়দেব রায় অধিকার লাভ করলে পীরবাড়ি নাম পাল্টে বর্তমান জয়দেবপুর রাখেন। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে এবং নানান উত্থানের মাধ্যমে গোলক নারায়ণের কাছে জমিদারি আসে। তার মা রানী সিদ্ধেশ্বরী দেবী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার জোরে জমিদারি আগলে রাখলেও মায়ের মৃত্যুর পর গোলক নারায়ণ জমিদারি পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন এবং নিজ পুত্র কালী নারায়ণের কাছে জমিদারির ভার তুলে দেন। তিনিই বর্তমান রাজবাড়ি পাকা করেন, মাধব মন্দির স্থাপন করেন, রাজবাড়ির পশ্চিমে দীঘি খনন করেন এবং রাজবাড়ির দক্ষিণে একটি বাজার বসান। স্ত্রী লক্ষ্মীপ্রিয়ার গর্ভে জন্মানো গোলক নারায়ণের সন্তান কালী নারায়ণ খ্যাত ছিলেন বিদ্যাশিক্ষায়। তিনি জয়দেবপুরে একটি বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে রাজেন্দ্রনারায়ণ নামে এক পুত্র সন্তান রেখে তিনি মারা যান। তারই নামানুসারে বর্তমান রাজেন্দ্রপুর নামক এলাকাটি রয়েছে। তার স্ত্রী রানী বিলাসমণি ছিলেন অত্যন্ত গুণবতী এবং শিক্ষানুরাগী। রাজা উপাধিতে ভূষিত রাজেন্দ্রনারায়ণ বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষ, বিদ্যাসাগর, সি-আই-ইকে ভাওয়ালের ম্যানেজার পদে নিযুক্ত করেছিলেন এবং উল্লেখযোগ্য স্থানীয় উন্নয়ন করেছিলেন। ইতিহাসে বহুল আলোচিত ভাওয়ালে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সমালোচনী সভা, পাশাপাশি রাজমাতা রানী বিলাসমণির নামানুসারে উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ। রানী বিলাসমণির তিন পুত্র সন্তান ছিলেন। তার মধ্যম পুত্র রাজা রমেন্দ্রনারায়ণ রায়। তিনিই কিংবদন্তি, সন্ন্যাসী রাজা। মৃত্যুর প্রায় ১২ বছর পর তিনি রাজবাড়িতে সন্ন্যাসী বেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিজেকে রাজা পরিচয় দিয়ে সিংহাসন দাবি করেন।

রাজা ভোগবিলাসে মত্ত

রমেন্দ্রনারায়ণ ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণের মেজো পুত্র। রাজমাতা, রানী বিলাসমণি ছিলেন তেজস্বিনী ও দূরদর্শীসম্পন্না একজন মা। তিনি নিজে দরিদ্র ঘরের সন্তান ছিলেন। রানীমাতা হিসেবে নিজ পরগণার প্রজাদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ ভোগ-বিলাসে এতটাই মত্ত ছিলেন যে, স্বাভাাবিক রাজ্য পরিচালনা তো দূরে

থাক নিজেকেই গুছিয়ে রাখতে পারতেন না। তাই রাজমাতা বিলাসমণিই প্রকৃত অর্থে জমিদারি দেখভাল করতেন। এস্টেটের ম্যানেজার বিখ্যাত সাহিত্যিক কালীপ্রসন্ন ঘোষ রাজার এই খামখেয়ালি মেজাজ কাজে লাগান। রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণকে নারী ও নেশার দিকে ঠেলে দেন, বিলাসী জীবনযাপনে রাজকোষের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। রানী বিলাসমণির চোখ এড়ায়নি এই চাক্রান্ত। নিজ সন্তানদের এসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাদের জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কুমারদের জন্য মিস্টার হোয়াটন নামক একজন শিক্ষক নিযুক্ত করেন। অবশ্য এতে খুব একটা লাভ হয়নি। তারা পড়াশোনায় একদমই মন দেননি। মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ ব্যতিক্রম ছিলেন না। হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।  রাজা ও রাজমাতার কোনো কথাই কুমাররা কানে তুলতেন না।

রানী বিলাসমণির মৃত্যুর পরই শুরু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র

১৯০১ সালে রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়। জমিদারি হাতে তুলে নেন রানী বিলাসমণি। জমিদারি ও সংসার গোছানোয় মন দেন। ১৯০২ সালে মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণের বিয়ে দেন তিনি। মেজোকুমারের স্ত্রী বিভাবতী ছিলেন আগুন সুন্দরী। সুন্দরী স্ত্রীও মন ভুলাতে পারেননি মেজোকুমারের। তিনি ব্যস্ত এক বাইজিকে নিয়ে। স্ত্রী বিভাবতীর সঙ্গে তার স্বাভাবিক কোনো সম্পর্কই ছিল না। এসব নিয়ে বিভাবতী ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন। মেজোকুমার কখনই ব্যক্তিত্ববান হয়ে উঠতে পারেননি। শিকারে যেতেন, টমটম হাঁকাতেন। শুধু মেজোকুমার না, অন্য দুই কুমারের অবস্থাও বিশেষ ভালো ছিল না। ১৯০৭ সালে রাজমাতা রানী বিলাসমণির মৃত্যু হয়। ভাওয়াল রাজপরিবারে দেখা দিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সেসবে খেয়াল নেই কুমারদের। তারা ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত। অবাধ নারীসঙ্গে  মেজোকুমারের কুৎসিত ব্যাধি দেখা দিল। ঢাকা থেকে চিকিৎসকরা এলেন। তারা বললেন, মেজোকুমারকে কলকাতা নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। রাজমাতার মৃত্যুর পরের বছরই রানী বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাওয়াল রাজবাড়িতে আসেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন তিনিও। সত্যেন্দ্র রাজবাড়িতে এসেছিলেন শিলংয়ে ডেপুটির চাকরি নেবেন বলে। অবশ্য সেদিকে আর যাননি। খুব টেরে পেয়ে গেলেন জমিদারিতে কুমারদের যে অবস্থা, তাতে নিজের আখের গোছানোর বড়ই সুযোগ! রাজবাড়িতে রানী বিভাবতীর চেয়ে বেশি প্রতাপে চলতেন তিনি। মেজোকুমারকে কলকাতায় চিকিৎসা করানোর জন্য যারা সঙ্গে গিয়েছিলেন তাদের মাঝে সত্যেন্দ্রনাথও ছিলেন। বড় কুমার ও তার স্ত্রী, মেজোকুমার ও বিভাবতীর সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। কলকাতায় কয়েকদিন থাকার পরেই তারা জয়দেবপুরে ফিরে আসেন। কারণ লর্ড কিচেনারসহ আরও দুজন সাহেব শিকারে যাবেন। পরে অন্য দুই কুমারসহ তারা শিকারে গিয়েছিলেন। কলকাতায় চিকিৎসা নিয়েও মেজোকুমারের স্বাস্থ্যের তেমন উন্নতি হয়নি। রাজপরিবারে সিদ্ধান্ত হলো, দার্জিলিংয়ে বাতাস গায়ে লাগিয়ে দেখা যাক- এসব বুদ্ধি আসে স্ত্রী বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রের মাথা থেকেই। মেজোকুমারের সঙ্গে তার সখ্যতা ততদিনে চূড়ায়। দার্জিলিং যাওয়ার আগের দিন রাতে রাজপরিবারের ডাক্তার আশু ডাক্তারের পিতা মহিম বাবুর বাড়িতে মেজোকুমার নিমন্ত্রণ খেয়েছিলেন। পরদিন দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে রাজবাড়ি ছাড়লেন তারা। ১৯০৯ সালের ১৮ এপ্রিল মেজোকুমার, মেজরানী, তার ভাই সত্যেন্দ্র, আশুতোষ ডাক্তারসহ প্রায় বিশজনের দল নিয়ে দার্জিলিংয়ে রওনা হন এবং ২০ এপ্রিল এসে পৌঁছান। সেখানে প্রায় পনের দিন বিলিয়ার্ড, তাস খেলে কাটালেন। হঠাৎ একজন খবর দিল টাইগার হিলে পাহাড়ি ভাল্লুক আছে। এ কথা শুনেই মেজোকুমার বললেন, শিকারে যাব। শেষ পর্যন্ত তার আর শিকারে যাওয়া হয়নি। মে মাসের ৫ তারিখের দিকে তিনি ভয়াবহ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

মৃত্যুর ১২ বছর পর এক সন্ন্যাসী এসে বলল আমিই ভাওয়াল রাজা!

মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসায় ছিলেন আশু ডাক্তার। পরদিন সিভিল সার্জন বদহজমের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় স্ত্রী বিভাবতী যথাসম্ভব স্বামীর কাছে থাকতে চাইলেও তার ভাই সত্যেন্দ্র তাকে আলাদা ঘরে রাখেন। এ দুই দিন পর ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের ডাক্তার ক্যালভার্ট মেজোকুমারকে মরফিয়া ইঞ্জেকশন দেন। এর পরই বমি ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা করায় মেজোকুমারের শারীরিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ হয়ে পড়ে। মেজোকুমারের চিকিৎসার খবর নিয়মিত দার্জিলিং থেকে টেলিগ্রাম করে জানানো হচ্ছিল। রানী বিভাবতীর মামা বি বি সরকার নামে একজন ডাক্তার নিয়ে এসে মেজোকুমারের অবস্থা দেখে যান। ডাক্তার সরকার মেজোকুমারকে মৃত বলে ঘোষণা করে গিয়েছিলেন হয়তো। তবে এ কথা মানতে নারাজ স্ত্রী বিভাবতী। এখানে একটি দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। পরদিন ১০ মে সকালে মেজোকুমারের মৃত্যুর খবর টেলিগ্রাম করে সবাই দার্জিলিং ত্যাগ করে জয়দেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। ১১ মে মাঝরাতে বিভাবতী জয়দেবপুরে ফিরে আসেন। রাজবাড়িতে শোকের ছায়া নেমে পড়ে। ১৮ মে মেজোকুমারের শ্রাদ্ধ করা হয়েছিল। এই সময় গুজব ছড়িয়ে গেল মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণের মৃতদেহের শ্রাদ্ধ নাকি ঠিকভাবে করা হয়নি। প্রায় চার মাস পরে আবারও গুজব উঠল, মেজোকুমার জীবিত আছেন।  মেজোকুমারের মৃত্যুর পর প্রাসাদ আদতে সত্যেন্দ্রনাথের হাতের মুঠোয় চলে আসে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ছোটকুমার ও বড় কুমার মারা গেলে রাজবাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়। রাজবাড়ির তিন রানীই ছিলেন সন্তানহীনা এবং তারা সবাই কলকাতায় পাড়ি জমান। কুমারদের একমাত্র পিসিমা সত্যভামা রাজবাড়িতে ফিরে আসেন। ভাওয়াল এস্টেটের অবস্থা যতই দুর্বল হচ্ছিল মেজোকুমার জীবিত আছেন এবং তিনি একদিন ফিরে আসবেন এই গুজব ততই শক্তিশালী হচ্ছিল। হলোই তাই, রাজবাড়ির ভিতরে মাধববাড়িতে একজন মৌন সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। শুরু হয় নতুন উত্তেজনা। চারদিকে খবর রটে যায় ভাওয়াল রাজ মেজোকুমার ফিরে এসেছেন।

দাই মায়ের নাম বলতেই জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে প্রজারা

১৯২১ সালের দিকে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাবের বক্তব্য পাওয়া যায়। জটাচুল, ঘন দাড়ি, সারা গা ভস্মাচ্ছাদিত সন্ন্যাসীর সামনে ধুনি জ্বলছে। রাস্তার লোকেরা তাকে ফিরে ফিরে দেখে যেত। পরিচয় জানতে চাইলে সন্ন্যাসী বলতেন, আত্মপরিচয় দিতে গুরুর নিষেধ আছে। কেউ কেউ তখনই সন্ন্যাসীকে ভাওয়াল রাজা বলে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন। একদিন কুমারের মেজোদিদি জ্যোতির্ময়ীর ছেলে বুদ্ধুবাবু জমিদার অতুল প্রসাদ রায় চৌধুরীকে নিয়ে সন্ন্যাসীকে দেখে এসেছিলেন। অতুল বাবু সন্ন্যাসীকে রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন। মাধববাড়িতে ছাইমাখা সন্ন্যাসীর আগমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রজাদের মাঝে নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই সন্ন্যাসীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীর সঙ্গে হিন্দিতে কিছু আলাপ করেছিলেন। সন্ন্যাসী পরবর্তী দিনগুলোতে বেশ কয়েকবার রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছিলেন। রাজপরিবারের উদ্দেশ্য ছিল সন্ন্যাসীর সঙ্গে মেজোকুমারের মিলগুলো মিলিয়ে দেখা। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে বাঁধিয়ে আনা অন্য কুমারদের ছবিগুলো সন্ন্যাসীকে দেখতে দেওয়া হলে সন্ন্যাসী কাঁদতে আরম্ভ করেন। তার কান্না দেখে জ্যোতির্ময়ী দেবীও কেঁদে ফেলেন। ৩০ এপ্রিল সন্ন্যাসী চন্দ্রনাথ আর সীতাকুণ্ড থেকে আবার জয়দেবপুরে রাজবাড়িতে ফিরে আসেন। তার দুই দিন বাদে চিলাই খালে সন্ন্যাসী সন্ধান করতে গেলে জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীর গায়ে মেজোকুমারের বিশেষ দাগগুলো দেখতে পান। ইতিমধ্যে সন্ন্যাসীর আচরণ, কথন, চাহনী, গায়ের প্রকৃত রং, চেহারা ইত্যাদি মেজোকুমারের সঙ্গে বিশেষ মিল থাকায় সন্ন্যাসীকে কথিত মৃত মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ বলে যে সন্দেহ করা হয়েছিল, গায়ের কাটা দাগ ও কয়েকটি জন্মগত দাগ হুবহু মিলে যাওয়ায় জ্যোতির্ময়ী দেবী সরাসরি সন্ন্যাসীর পরিচয় প্রকাশ করতে ব্যাপক চাপ দেন। রাজপরিবারের সদস্যরা এবং প্রজাগণ সন্ন্যাসীর উত্তরের জন্য রাজবাড়িতে ভিড় করে। সারা জয়দেবপুরে রটে যায় এ খবর। সেদিন সকালেই হাজারো প্রজার সামনে জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীকে বলেন, ‘তোমার চেহারা আর শরীরের চিহ্নগুলো আমার মেজো ভাইয়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তুমিই আমার নিরুদ্দিষ্ট মেজোকুমার। তুমি তোমার পরিচয় প্রকাশ কর।’ কিন্তু সন্ন্যাসী তখনই কোনো জবাব দেয়নি। শেষ বিকালের দিকে জনতার কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে সন্ন্যাসী বলতে শুরু করেন, ‘আমার নাম রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী।’ উৎসুক জনতার মাঝ থেকে প্রশ্ন আসে তোমার মায়ের নাম কী? সন্ন্যাসী জবাব দেন, ‘রানী বিলাসমণি।’ আবারও প্রশ্ন আসে আপনাকে যে মানুষ করেছিল সেই দাইয়ের নাম কী? মৃদু কম্পমান গলায় সন্ন্যাসী উত্তর করেন, ‘অলকা।’ ধাত্রী মায়ের নাম বলেই সন্ন্যাসী অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। দাই মায়ের নাম সঠিকভাবে উত্তর করার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত জনতা উলুধ্বনি ও জয়ধ্বনি করে ওঠে, রাজবাড়ি মুহুর্মুহু কেঁপে ওঠে সমবেত জনতার জয়ধ্বনিতে। প্রজারা বলাবলি করতে শুরু করে ইনিই প্রকৃত মেজোকুমার।

মৃতপ্রায় রাজাকে শ্মশান থেকে তুলে এনেছিলেন সন্ন্যাসীরা

কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইংলিসম্যান কাগজে ৭ মে ঢাকা সেনসেশন শিরোনামে সন্ন্যাসী নিজেকে ভাওয়াল রাজা মেজোকুমার বলে দাবি করেছেন বলে খবরটি প্রচার করেছিল। প্রজারা খাজনার রসিদে মেজোকুমারের নাম রাখার দাবি করল। সন্ন্যাসী অত দিনে জয়দেবপুরের রাজবাড়ি ছেড়ে ঢাকায় জ্যোতির্ময়ী দেবীর বাসায় গিয়ে উঠেছেন। এরই মাঝে রানী সত্যভামা দেবী কলকাতা থেকে ঢাকায় জ্যোতির্ময়ী দেবীর বাসায় এসে সন্ন্যাসীকে দেখে মতামত দেন- এই সন্ন্যাসীই কথিত মৃত মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়। কিন্তু এত দিনেও স্ত্রী বিভাবতী সন্ন্যাসীর কোনো খোঁজ-খবর নেননি।

আদালতে ঐতিহাসিক মামলা

১৯২৯ সালে সন্ন্যাসী ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ১৯৩০ সালের ২৪ এপ্রিল নিজেকে মৃত রাজা রমেন্দ্রনারায়ণ বলে দাবি করে ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারি চেয়ে আদালতে মামলা করেন। প্রতিবাদী ছিলেন রানী বিভাবতী তবে কলকাঠি নেড়েছিল তার ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ও আশু ডাক্তার। চার বছর পরে এই ঐতিহাসিক মামলাটির শুনানি শুরু হয়। দেশের বাইরেও বিলাতে এর কমিশন গঠন করা হয়েছিল। আদালতে মোট ১ হাজার ৬৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছিল, এর মাঝে ৯৬৭ জন সন্ন্যাসীকে মেজোকুমার বলে সাক্ষী দিয়েছিল। প্রতিবাদিনীর পক্ষে যারা ছিলেন তাদের এক অংশ ভাওয়াল স্টেটের কর্মচারী ছিলেন বলেই চাকরি ও হয়রানির ভয়ে সন্ন্যাসীর বিপক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন বলে পরে জানা যায়। প্রতিবাদিনীর ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই আর আদালতে টিকতে পারছিল না। মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণের উচ্চতা, জামার মাপ, জুতার মাপ, চুলের রং, শরীরের বিশেষ চিহ্নগুলো সবকিছুতেই সন্ন্যাসী মেজোকুমার বলে প্রতীয়মান হন। বিশেষ করে ডাক্তাররা মেজোকুমারের শরীরে যে কয়েকটি বিশেষ জন্মগত দাগ, তিল, ফোঁড়ার দাগ ও দুর্ঘটনার ফলে আঘাতের চিহ্ন রয়েছিল তার সবগুলোই হুবহু খুঁজে পান। প্রতিবাদিনীর ব্যারিস্টারের কোনো যুক্তিতর্কই আদালতে টিকল না।

কাঠগড়ায় যা বলেছিলেন সন্ন্যাসী

আদালতে সন্ন্যাসী ধীরে ধরে বলে গেলেন অভূতপূর্ব, অবিশ্বাস্য এবং রোমাঞ্চকর সেই ঘটনা। দার্জিলিংয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর শেষ যা মনে আছে তিনি বলতে লাগলেন- আমার পেট ফাঁপত। আশু ডাক্তার কাঁচের গ্লাসে করে আমাকে কী একটা ঔষধ খেতে দিয়েছিল। সেটা খাওয়ার পর থেকে বুক জ্বালা করতে লাগল, বমি হলো, সারা শরীর ছটফট করতে লাগল। সেই রাত্রে আমি চিৎকার করে সবাইকে ডাকছিলাম কিন্তু কেউ ডাক্তার ডেকে পাঠায়নি। পরদিন শরীর আরও খারাপের দিকে গেল, আমি যে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম সেটা খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছিলাম। এক সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ি। যখন চোখ মেলি দেখি পাশে চারজন সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমি কোথায়? তারা ইশারায় ও মৃদু স্বরে আমাকে হিন্দিতে জবাব দিয়েছিল কথা না বলতে। আমি তখন আর কথা বলিনি। সুস্থ হয়ে উঠলে আমি সন্ন্যাসীদের সঙ্গে  পায়ে হেঁটে ও ট্রেনে চেপে আমি বহু দেশ-বিদেশ ঘুরতে থাকি। বছরের পর বছর যেতে থাকে আমি অনেকবার মনে করার চেষ্টা করেছিলাম আমি কে, কিন্তু মনে করতে পারতাম না। তবে দার্জিলিংয়ে আমাকে সন্ন্যাসীরা গা ভেজা অবস্থায় পেয়েছিল এটা অল্প অল্প মনে পড়ত। আমি মাঝে মাঝেই আমার গুরুকে জিজ্ঞেস করতাম, বাড়ি ফেরার কথা বলতাম, গুরু জবাব দিতেন, সময় হলেই যাবি। আমি এভাবে বহু বছর এদেশ-ওদেশ বেড়িয়ে নেপালে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে তিব্বত। আবার নেপালে ফিরে আসার পথে গুরু বললেন, তোর বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। আমি গৌহাটি থেকে ট্রেনে চেপে ফুলছড়ি হয়ে ঢাকায় আসি। বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে আমি বসে থাকতাম। অনেকে আমাকে দেখতে ভিড় জমাত। কাশিমপুরের অতুল প্রসাদ রায়কে দেখে আমি চিনতে পারছিলাম। অনেকেই আমাকে ভাওয়াল রাজা বলে ভিড় জমাত। আমি জয়দেবপুরে হাতির পিঠে চেপে ফিরে আসি।

শরীরে হুবহু মিলল জন্মদাগ রায় গেল সন্ন্যাসীর পক্ষে

সন্ন্যাসী গুরু ধরম দাস নাগা সাক্ষী দিতে বলেন- আমরা মোট চারজন সন্ন্যাসী ঘুরতে ঘুরতে দার্জিলিং এসে পড়েছিলাম। রাতের প্রথম প্রহরে আমরা যখন ধর্মালোচনায় ব্যস্ত তখন গুহা থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম একদল লোক হরিবোল ধ্বনিতে শ্মশানে জমায়েত হয়েছে। তখন বাইরে বেশ বৃষ্টি পড়ছিল আর থেকে থেকে বাজ পড়ছিল বলে আমরা কেউই গুহা থেকে বাইরে বেরোয়নি। শ্মশানের কোথাও থেকে মানুষের কাতরানোর আওয়াজ শুনতে পাই। গুরুকে ফিরে এসে এ কথা জানানোতে তিনিও গুহা ছেড়ে বাইরে আসেন, আমরা শ্মশানের পূর্ব দিকে পা চালিয়ে যাই। কাতরানোর আওয়াজ খুঁজে পেয়ে দেখি এক লোক খাটিয়ার ওপর শুয়ে আছে। তাকে উদ্ধার করেছিলাম আমরা। পাহাড়ের নিচের দিকে একটা ঘর ছিল, বৃষ্টি ক্রমেই বাড়ছিল বলে আমরা তাকে ওই ঘরটার কাছে নিয়ে যাই। ঘরে তালা লাগানো ছিল কিন্তু কাউকে না দেখে লোকনাথ বাবা বললেন, তালা ভেঙে ফেল। আমরা তাকে পাহাড়ের নিচে ওই ঘরটায় সে রাতের মতো নিয়ে রাখি। পরের দিন লোকটির জ্ঞান ফিরে আসলেও সে কোনো পরিচয় দিতে পারছিল না। এরপর ১৯৩৬ সালের ২৪ আগস্ট বিচারপতি পান্না লাল বসু ভাওয়াল রাজবাড়ির সন্ন্যাসী মামলাটির ঐতিহাসিক রায় দেন। দীর্ঘ রায়ের সংক্ষিপ্ত রূপে তিনি বলেন, বাদীকে শনাক্ত করার জন্য সর্বোত্তম প্রমাণ ছিল তার দেহের কতগুলো চিহ্ন, যেগুলো অঙ্কের মতোই নির্ভুলভাবে প্রমাণিত। দুজন ব্যক্তির একই রকম চেহারা থাকতে পারে কিন্তু দুজনের দেহে একই দাগ হুবহু মিলে যেতে পারে না। আমি বিচারে এই সাব্যস্ত করছি যে, বাদীই ভাওয়ালে মৃত রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় পুত্র রমেন্দ্রনারায়ণ রায়।

সবাই স্বীকার করলেও স্ত্রী বললেন, এই লোক প্রতারক

মামলার রায় বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই আদালত প্রাঙ্গণে সমবেত জনতা ঢাকার আরমানিটোলার বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে। সেই বাড়িতে সন্ন্যাসী ছাড়াও জ্যোতির্ময়ী দেবী তখন ছিলেন। ঢাকার পথে ভাওয়াল রাজার জয়ধ্বনিতে শোভাযাত্রা হয়। পরবর্তীতে রানী বিভাবতীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতার হাই কোর্টে ১৯৪০ সালে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন, সেটাও ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই আদালত খারিজ করে দেয় এবং সন্ন্যাসীকে মেজোকুমার বলে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আদালত ভাওয়াল স্টেটের এক-তৃতীয়াংশ আইন মতে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। তার স্ত্রী বিভাবতী ও অন্য ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। কিন্তু তারা সন্ন্যাসীকে মেজোকুমার বলে মেনে নেননি। উল্টো সবাই স্বীকার করলেও স্ত্রী বললেন, এই লোক প্রতারক।

সন্ন্যাস রাজা ভাওয়াল রাজবাড়ির শাসনভার হাতে পেয়েও খুব বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি। পরবর্তীতে তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু হলেও তিনি এখনো কিংবদন্তি।

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »