রফতানি বন্ধ করল পেঁয়াজ ভারত

আনুষ্ঠানিকভাবে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করেছে ভারত। গতকাল দুপুরের পর থেকে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় কোনো পেঁয়াজ প্রবেশ না করলে ব্যবসায়ীদের শঙ্কা বাড়তে থাকে। রাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের নির্দেশনা জারি করে। যা দেশটির আমদানিকারকদের কাছে পৌঁছে।

জানা গেছে, ভারত থেকে মূলত সাতক্ষীরার ভোমরা, দিনাজপুরের হিলি ও যশোরের বেনাপোল দিয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয়। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গতকাল আকস্মিকভাবে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা শঙ্কা করতে থাকে রফতানি বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে ভারত। এছাড়া বাংলাদেশে পণ্যটির রফতানি মূল্য বাড়ানোর তাগিদে সেখানকার পেঁয়াজ রফতানিকারক ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সিদ্ধান্তে পেঁয়াজবাহী ট্রাকগুলো আটকে দিতে পারে। মূলত ভারতের স্থানীয় বাজারে পণ্যটির মূল্য আকাশচুম্বী হওয়ার কারণে স্থানীয় কাস্টমসকে পণ্যটির রফতানি বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে, এমন অভাস পাচ্ছিলেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানাচ্ছিলেন দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে শিগগিরই একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। তবে ভারত থেকে যে কারণেই পণ্যটির আমদানি বন্ধ হোক না কেন, দেশের বাজারে পেঁয়াজের মূল্যে আবার অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ অন্যান্য দেশ থেকে পণ্যটি আমদানির জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু এলসি খুলে রেখেছেন বাংলাদেশী আমদানিকারকরা।

সম্প্রতি ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী প্রদেশগুলোয় অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে পণ্যটির উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে চাহিদার অনুপাতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেখানকার বাজারে পণ্যটির মূল্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় গতকাল দুপুর থেকে দেশের সবগুলো স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজবাহী ট্রাক প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গতকাল সকালে ৫০ টন পেঁয়াজ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর পর থেকে আর কোনো পেঁয়াজবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। বেনাপোলের ওপারে পেট্রাপোল স্থলবন্দরে বর্তমানে পেঁয়াজবাহী প্রায় দেড়শ ট্রাক আটকা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পেট্রাপোল রফতানিকারক সমিতির পক্ষে ব্যবসায়ী কার্তিক ঘোষ বলেন, ভারত থেকে বর্তমানে ২৫০ ডলারে পেঁয়াজ আমদানি হয়ে আসছে। কিন্তু বন্যার কারণে ভারতের নাসিকে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্যটির রফতানিকারকরা স্থানীয় বাজারদর হিসেবে ৭৫০ ডলারের নিচে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর আটকে দেয়া হয় বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা সব পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাক।

বিষয়টি নিয়ে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার আজিজুর রহমান বলেন, ভারত কোনো ঘোষণা ছাড়াই মূল্যবৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। পারস্পরিক বাণিজ্যে সমঝোতার বিকল্প নেই। তারা রফতানি বন্ধ না করে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের সময় বেঁধে দিতে পারত। হঠাৎ নেয়া এমন সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন এপারের আমদানিকারকরা।

ভারতের হিলি স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শংকর দাস বলেন, বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভারতীয় বাজারে সরবরাহ হ্রাস পেয়েছে। ফলে এখানে পেঁয়াজের দাম এখন বাড়তির দিকে। এ অবস্থায় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি রুখতে হিলি কাস্টমসে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ভারত সরকার। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ থাকবে। এছাড়া পেঁয়াজ আমদানির জন্য এরই মধ্যে যেসব এলসি খোলা রয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে, সেগুলোর বিপরীতেও কোনো পেঁয়াজ রফতানি হবে না।

আমদানিকারকরা বলছেন, ভারতের এ সিদ্ধান্তের কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন। আমরা তাদের বলছি আমাদের যেসব এলসি খোলা রয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে পণ্য রফতানির জন্য। অনেক এলসির বিপরীতে ভারতে পেঁয়াজ রফতানির উদ্দেশ্যে ট্রাকে লোড করা রয়েছে। ট্রাকগুলো মাল নিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন যদি তারা পেঁয়াজ না দেয়, তাহলে আমাদের এসব পেঁয়াজের কী অবস্থা হবে, সে চিন্তার মধ্যে পড়েছি। রফতানিকারক তো ঠিকই ব্যাংকে বিল সাবমিট করবে। তাই অতিসত্বর সরকারি পর্যায়ে বৈঠক করে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। তবে তারা যদি একেবারেই পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় তাহলে গতবারের মতো সমস্যা হবে না। কারণ এরই মধ্যে অনেক আমদানিকারক বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন। অচিরেই সেসব পেঁয়াজ দেশে চলে আসবে।

এ বিষয়ে হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম ও হারুন উর রশীদ বলেন, ভারতীয় রফতানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা আমাদের জানিয়েছেন, সেখান থেকে কোনো পেঁয়াজ রফতানি হবে না। যেসব এলসির বিপরীতে পেঁয়াজ রফতানির জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে, সে পেঁয়াজও তারা রফতানি করবে না। একে পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়ানোর একটি কৌশল বলেও মনে হচ্ছে। বিপুল পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির জন্য আমাদের অনেক আমদানিকারকের এলসি খোলা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *