সাড়ে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলো

স্টাফ রিপোর্টার

কভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠছিল বিশ্ব। চলতি বছরের শুরু থেকেই আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফেরে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারগুলো। এ অবস্থায় দেখা দেয় ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব। কভিডের নতুন ধরন প্রভাবিত করে বিনিয়োগকারীদের। শেয়ারদরে পতন দেখা দেয় এয়ারলাইনস ও জ্বালানি তেল পণ্যের মতো ভ্রমণ-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর। ফলে গত সপ্তাহে বৈশ্বিক বাজার মূলধন ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার বা ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

নিক্কেই এশিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতি দেখা দেয়। বিভিন্ন দেশ কভিডজনিত বিধিনিষেধগুলো আবারো কঠোর করে। নানা অনিশ্চয়তায় আস্থা হারিয়ে ফেলেন বিনিয়োগকারীরা। ভ্রমণ-সম্পর্কিত ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বিক্রিতে হিড়িক পড়ে।

ওমিক্রন শনাক্ত হওয়ার আগেই নভেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপে পুঁজিবাজারগুলোর মূলধন সাময়িক সময়ের জন্য ৪-৫ শতাংশ কমে যায়। শেয়ারদর পতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল এয়ারলাইনস ও হোটেলের মতো ভ্রমণ-সম্পর্কিত শিল্প।

বৈশ্বিক এয়ারলাইনস ও এভিয়েশন খাতের শেয়ারের সূচক ট্র্যাক করা ইউএস গ্লোবাল জেটস জানিয়েছে, এ খাতের শেয়ারদর ২০ ডলারের নিচে নেমে গেছে। এমন অবস্থা শেষবার ২০২০ সালের নভেম্বরে দেখা গিয়েছিল।

বিনিয়োগ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইসের জাপানি ইউনিটের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সোইচিরো মাতসুমোতো বলেন, নতুন প্রাদুর্ভাবের কারণে ঘন ঘন ব্যবসায়িক ভ্রমণের সেই কভিডপূর্ব জীবনধারা ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রোববার পর্যন্ত হাওয়াই ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ১৫টি ওমিক্রনের সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। ক্রমেই ছড়িয়ে পড়া এ সংক্রমণ অর্থনীতি স্বাভাবিকীকরণ ও সরবরাহ চেইনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ অবস্থায় মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দশমিক ৪ শতাংশ কমিয়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।

কভিডের পর থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট রেসপন্স ট্র্যাকারে ০-১০০ স্কেলে মহামারীর বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ বর্ণনা করে। ইউরোপে সামাজিক কার্যক্রমের ওপর কভিডজনিত বিধিনিষেধ আরো কঠিন করা হয়েছে। ২৭ দেশের ব্লকটির বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানির এ সূচক বেড়ে ৭০ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এভাবে কভিডজনিত বিধিনিষেধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে আরোপ করা হতে পারে—এমন উদ্বেগ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কারণ এশিয়াজুড়ে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে কভিডজনিত বিধিনিষেধ বাড়লে চলমান সরবরাহ চেইনের জটিলতা আরো ভয়াবহ হবে।

ওমিক্রন শনাক্তের পর থেকে বিশ্বজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী পণ্যের বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্য কমতে শুরু করেছে। নভেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তিমূল্য ১৩ শতাংশ কমেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬২ ডলারে নেমে আসে। এ মূল্য আগস্টের পর থেকে সর্বনিম্ন।

নরওয়েজিয়ান গবেষণা সংস্থা রিসটাড এনার্জি পূর্বাভাস দিয়েছে, কভিডের নতুন সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে শহরগুলোয় লকডাউন ও সীমান্তে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেল কমে যেতে পারে। দাম কমার বিষয়টি ভোক্তা দেশগুলোয় কাঁচামাল ও জ্বালানি ব্যয় কমিয়ে দিলেও জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এছাড়া প্রতিটি দেশে মুদ্রানীতির পূর্বাভাসও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। এরই মধ্যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার বৃদ্ধি স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এমনটা করা হলে বাজারে তারল্য প্রবাহ অব্যাহত থাকবে এবং এ প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

জেপি মরগানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বাজার কৌশলবিদ শোগো ম্যাকাওয়া বলেন, এখনো অনেক কিছু আছে, যা আমরা জানি না। প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা ও নতুন তথ্যের ওপর নির্ভর করে বাজারের উত্থান ও পতনের ঝুঁকি রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.