সমুদ্র থেকে প্রতি বছর আড়াই লাখ কোটি ডলার আয়ের সম্ভাবনা

ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। আমাদের রয়েছে বিশাল সমুদ্রসীমা। এর তলদেশে যে সম্পদ রয়েছে তা টেকসই উন্নয়নের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার তথা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ উত্তোলন, মৎস্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা-মাফিক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর আড়াই লাখ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব।

দেশের স্থলভাগে যে পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান, তার প্রায় সমপরিমাণ (৮১ শতাংশ) সম্পদ সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে। অপার সম্ভাবনাময় এই খাতকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে সমুদ্রের তলদেশে কী কী সম্পদ রয়েছে, সেগুলো আহরণ করতে হলে কোন ধরনের প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জনবল প্রয়োজন, তা পরিকল্পনা-মাফিক নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সমুদ্র বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আগামী ৮ নভেম্বর আইডিইবির সুবর্ণ জয়ন্তী ও গণপ্রকৌশল দিবস। সমুদ্র সম্পদের অপার সম্ভাবনার বিষয়টি আমলে নিয়ে তারা এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘নীল অর্থনীতি এনে দেবে সমৃদ্ধি’।

আইডিইবি সভাপতি এ কে এম এ হামিদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি বা সমুদ্র অর্থনীতিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্লু ইকোনমির আধুনিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সমুদ্রে যে পানি আছে এবং এর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেসব সম্পদ যদি আমরা টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করি তবে তাকে ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতি বলে। ভারত মহাসাগরের ব-দ্বীপ বাংলাদেশের জন্য ব্লু ইকোনমি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বঙ্গবন্ধুর পথনির্দেশনায় আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ) রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ মিটিয়ে বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকার ওপর বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে। এই সমুদ্র বিজয়ের পর বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব উত্তরণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সমুদ্র সম্পদের গুরুত্ব ও অপার সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্থলভাগে যে পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান, এই সম্পদের প্রায় সমপরিমাণ (৮১ শতাংশ) সম্পদ সমুদ্র তলদেশে রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ উত্তোলন, মৎস্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন ক্ষেত্রে পরিকল্পনা-মাফিক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ কোটি মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, তথ্য-পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছসহ ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, তিন প্রজাতির লবস্টার, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়।
এছাড়া রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সম্পদ। সমুদ্র জয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরে ভারতের হাতে থাকা ১০টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে আটটি এবং মিয়ানমারের অধীনে থাকা ১৩টির মালিকানা বাংলাদেশ পেয়েছে। এসব ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব।

তেল-গ্যাস ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ১৩টি জায়গায় সোনার চেয়ে অধিক মূল্যবান বালু অর্থাৎ ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম রয়েছে যাতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গানেট, সেলিমেনাইট, জিরকন, রুনটাইল ও ম্যাগনেটাইট। এছাড়া সমুদ্রের গভীরে জমে আছে কাদা যা দিয়ে তৈরি হয় সিমেন্ট। বঙ্গোপসাগরের নিচে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল ও গ্যাস মজুত রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। এর মাধ্যমে আগামী দিনের জ্বালানি-রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আইডিইবি সভাপতি বলেন, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০০ কোটি। এই বিশাল মানুষের খাবার জোগান শুধুমাত্র ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সম্ভব নয়। গবেষকরা ধারণা করছেন যে, বিশাল এই জনগোষ্ঠীর খাবার জোগানোর জন্য সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে। বর্তমান বিশ্বে ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান আসে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু থেকে। ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ন্যূনতম ১.২৪ মিলিয়ন টন খনিজ বালুর সমাহার রয়েছে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে। এখানে মোট ১৭ প্রকার খনিজ বালুর সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাশনেটাইট, লিউকোক্সিন, কিয়ানাইট, মোনাজাইট দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে সক্ষমতা রাখতে পারে।

বিশ্বে ব্যবহৃত শতকরা ৫০ ভাগের বেশি ম্যাগনেশিয়াম সামুদ্রিক পানি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই প্রাকৃতিক উৎস থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিও হয়। এছাড়া সমুদ্রের বায়ু ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। সাগর থেকে প্রাপ্ত বায়ু, তরঙ্গ ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, জৈব-তাপীয় পরিবর্তন এবং লবণাক্তের মাত্রা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণে নবায়নযোগ্য শক্তির জোগান দেয়া সম্ভব বলে মনে করেন এ কে এম এ হামিদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *