লবণ উৎপাদনে ৬১ বছরের রেকর্ড

স্টাফ রিপোর্টার

চলতি অর্থবছরে দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার টন। যা গত ৬১ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া, চাষ যোগ্য জমি এবং চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে।

তবে উৎপাদন রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও তা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ হবে না। কারণ বর্তমানে দেশে লবণের চাহিদা ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টন। উৎপাদনের যে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে তা ৮ মে পর্যন্ত। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের বাকি ১৫ থেকে ২০ দিন যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে তাহলে আরো ২ লাখ টন লবণ উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু তাতেও চাহিদারে পরিমাণ ছুঁতে পারবে না উৎপাদন।

এর আগে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮ লাখ ২৪ হাজার টন। সেসময় লবনের চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টন। এরপর নানা কারণে দেশের লবনের উৎপাদন কমতে থাকে। এজন্য চাষীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলাসহ জমির পরিমাণ কমে যাওয়াকে কারণ হিসেবে মনে করা হয়।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে লবণের চাহিদা ছিল ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টন আর উৎপাদন হয়েছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার টন। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ২২ লাখ ৫৬ হাজার টন, কিন্তু চাহিদা পূরণ না হলেও উৎপাদন তার আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৫১ হাজার টনে।

বিসিক বলছে, দেশে আগের চেয়ে বেড়েছে লবণচাষী ও চাষের জমির পরিমাণ। চলতি অর্থবছরে ৩৭ হাজার ২৩১ জন চাষ লবণ চাষ করেছেন। এ সংখ্যা গত অর্থবছরে ছিল ২৭ হাজার ৬৯৭ জন। চাষীর এ সংখ্যা গত ১০ বছরে সর্বোচ্চ। একইসঙ্গে আগের অর্থবছরের চেয়ে এবার জমির পরিমাণ বেড়েছে ৮ হাজার ৬৩৭ একর। এবার দেশের ৬৩ হাজার ২৯১ একর জমিতে লবণ চাষ করা হয়েছে। এ পরিমাণ ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হতে এখনো ১০ থেকে ২০ দিন বাকি আছে। বিসিকের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া পেলে এবার উৎপাদন ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

দেশের চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলায় লবণ উৎপাদন হয়ে থাকে। লবণ উৎপাদনের জন্য পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ (পিপিটি) ১৫ এর উপরে থাকতে হয়। ফলে সমুদ্র উপকূলীয় কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, রামু, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, টেকনাফ এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী লবণ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। সমুদ্রের পানি এবং সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন করা হয় লবণ। ফলে আবহাওয়া লবণচাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্থানীয় লবণচাষীরা বলছেন, নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত থাকে লবণচাষের মৌসুম। এবার এ সময়ের মধ্যে বৃষ্টি কম হয়েছে। আবহাওয়া ছিল লবণ চাষের জন্য উপযুক্ত। সে কারণে লবণ উৎপাদন বেশি হয়েছে।

কক্সবাজারের লবণচাষী মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ বলেন, খুব বেশি না হলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার লবণের দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। তিনি মোট ১০ একর জমিতে লবণ চাষ করেছেন। মৌসুমে বৃষ্টি বাদল তেমন একটা হয়নি। লবণ চাষের জন্য আবহাওয়া ভালোই ছিল। তাই উৎপাদন বেড়েছে।

তবে জমির খাজনা, শ্রমিকের মজুরিসহ নানা আনুষাঙ্গিক খরচ মিলিয়ে খুব বেশি লাভ থাকে না বলে জানালেন এ চাষী। তারপরেও তিনি মনে করেন, লবণচাষে সুদিন ফিরছে।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে মাঠ পর্যায়ে ক্রড লবণের বাজার দর মণ প্রতি জুলাইয়ে ছিল ২১৫ টাকা। পর্যায়ক্রমে আগস্টে ২২০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ২২৫ টাকা, অক্টোবরে ২৭০ টাকা, নভেম্বরে ২৯৮ টাকা, ডিসেম্বরে ২৯৪ টাকা, জানুয়ারিতে ৩১৫ টাকা এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৩৪৪ টাকা। মার্চে এসে দাম কমে দাঁড়ায় ২৩১ টাকা এবং এপ্রিলে ২৬৪ টাকা। সবশেষ মে মাসে ২৭০ টাকায় মণপ্রতি অপরিশোধিত লবণ বিক্রি হচ্ছে।

প্রক্রিয়াজাতকরণের পরে কেজিপ্রতি আয়োডিন যুক্ত লবণ খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ট্র্যাডিশনাল ২০ টাকা, মেকানিক্যাল ২৪ টাকা, ভ্যাকুয়াম ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ বছর ৪ একর জমিতে লবণ চাষ করেছেন শাহজাহান মুনির। তিনি বলেন, সরকার আমদানি বন্ধ রাখায় এবার দাম ভালো পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আবহাওয়া ভালো থাকায় উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু খরচ উঠে আসলেও চাষীরা যে খুব বেশি লাভবান হচ্ছেন তা নয়। তাই তাদের কথা মাথায় রেখে সরকার যেন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়, সে দাবি জানান তিনি।

উপকূলীয় অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং গুণগত মানসম্পন্ন লবণ উৎপাদনের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে দেশে লবণ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে তৎকালীন ইপসিক, যা বর্তমানে বিসিক। মাত্র ৬ হাজার একর জমিতে শুরু হওয়া লবণ চাষ এখন ৬৩ হাজার একর ছাড়িয়েছে।

বিশেষ করে ২০০০ সালের পর থেকে দেশে বেড়েছে লবণ উৎপাদন। সেসময় থেকে লবণের মান উন্নয়ন এবং লবণ চাষ বৃদ্ধির লক্ষে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে প্লাস্টিক পদ্ধতিতে লবণ চাষে উৎসাহ দেয়া হয়। ফলে কম সময়ে ভালো মানের অধিক লবণ উৎপাদনের পথ সুগম হয়। এতে চাষিরা আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লবণচাষ মূলত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। এ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে চাষ যোগ্য জমির পরিমাণ। চাষীদেরও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। আর তাহলেই দেশের চাহিদা অনুযায়ী লবণ উৎপাদন করা যাবে। উৎপাদন বাড়লে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও করা সম্ভব হবে। সেইসঙ্গে আমদানি নির্ভরতাও এড়ান যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.