ফল বিক্রেতা থেকে ৭৭৪ বিঘা জমির মালিক

স্টাফ রিপোর্ট

মাথায় ফেরি করে ফল বিক্রি করা হজরত আলী এখন ৭৭৪ বিঘা জমির মালিক। সেখানে চাষ করেন নানা ধরনের ফলের। লক্ষ‌্য, দেশবাসীকে বিষমুক্ত ফল খাওয়ানো। এমনই এক প্রতিভাবান আত্মপ্রত্যয়ী যুবক শেরপুরের হজরত আলী আকন্দ।

জেলা সদরের ভাতশালা ইউনিয়নের হাজী ইব্রাহিম খলিলুল্লাহর তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় তিনি। সংসারে অভাবের কারণে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই জীবিকার তাগিদে মামার হাতধরে ছুটে যান ঢাকা শহরে। কাজ নেন মুদি দোকানে। কিন্তু কয়েকমাস পরেই বন্ধ হয়ে যায় দোকানটি। শুরু হয় আবারও জীবন যুদ্ধ। কাজ করেন গার্মেন্টসকর্মী হিসেবে। সেখানেও কাজ করা হয় না তার। শুরু করেন মাথায় ফেরি করে ফল বিক্রির কাজ। স্বপ্নবাজ হজরত তখনই স্বপ্ন দেখেন বড় ব্যবসার। স্বপ্ন পূরণে দ্বারস্থ হন আতœীয়দের। পেয়েও যান ব্যবসা শুরুর জন্য ২০ হাজার টাকা। ঢাকা শহরের যাত্রাবাড়ীতে মাত্র ১৫০০ টাকায় দোকান ভাড়া নিয়ে শুরু করেন মুদি দোকান। নিজের সততা আর পরিশ্রমে সেখানে এখন তৈরি হয়েছে দেড়শ লোকের কর্মসংস্থান।

ব্যবসার ফাঁকে তিনি চিন্তা করেন, নিজ এলাকায় ফলের বাগান করবেন। অদম্য হজরত মুদি ব্যবসায় থেমে না থেকে স্বপ্ন দেখেন কীভাবে নিজের এলাকায় কিছু করা যায়। ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে শুরু করেন বিভিন্ন কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া। ফলের ব‌্যবসা থেকে আয় করা টাকা দিয়ে শেরপুর রৌহা গ্রামে ধীরে ধীরে কিনে ফেলেন ১০০ বিঘা জমি। ২০১৯ সাল থেকে হজরত আলী ওই জমিতে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা, কমলা, আঙুর, ড্রাগন, লটকন, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, কুল, সৌদি খেজুরসহ ১২ প্রজাতির ফলের চাষ শুরু করেন। একই সঙ্গে বিদেশি উন্নত জাতের এমকাটো, ফ্রাই ছবেদা, মালবেরি, থাই সরিষাসহ আরও ২৭১টি জাতের ফলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেন।

এরই মধ্যে তিনি শেরপুর সদর উপজেলার রৌহা, ভাতশালা, কামারিয়া ও বলায়েরচর ইউনিয়নে প্রায় ৭৭৪ বিঘা জমিতে ১২টি ফল ও চারা উৎপাদন বাগান করেছেন। নিজের ১০০ বিঘার পাশাপাশি বাকি জমি তিনি ২০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। শেরপুরের সমতল মাটি মাল্টা, আঙুরসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ফল চাষে উপযুক্ত এটা প্রমাণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন হজরত আলী। তার মিশ্র ফল বাগানগুলো থেকে তিন বছরের মধ্যেই মুনাফা আসতে শুরু করে। ফলবাগানের পাশাপাশি সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনায় হাত দিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে ফল বাগানের পাশাপাশি মাছ, মুরগি, কবুতর ও গরু পালন শুরু করেছেন। তাকে দেখে এখন আরও অনেক কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়ে ফল বাগান শুরু করেছেন।

ফার্মের ম্যানেজার আবু সাইদ বলেন, ‘বাগানের ফল গাছে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। ফল বিক্রির সময়ও ব্যবহার করা হয় না কোনো ফরমালিন। তাই সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এসব ফলের চাহিদা অনেক বেশি। এছাড়া, আমরা বিভিন্ন শহরে ছাদবাগান করে দিই। আমরা এই পর্যন্ত শতাধিক ছাদবাগান করে দিয়েছি। আমাদের উৎপাদিত ফল শেরপুরের চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ময়মনসিংহসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে আমাদের ফল বিক্রি হচ্ছে।’

হজরত আলী বলেন, ‘প্রতিদিনই অনেকেই আমার ফলবাগান দেখতে আসেন। এতে আমার ভালো লাগে। কেউ কেউ ফল কেনেন, আবার কেউ কেউ ফল বাগান করার সহায়তা চান। আমি ব্যবসার পাশাপাশি চিন্তা করি দেশের মানুষকে কীভাবে বিষমুক্ত ফল খাওয়ানো যায়। ফল চাষ ভালো হওয়ায় একটি নার্সারি ও ১১টি ফলের বাগান করেছি। বর্তমানে আমার ফলের বাগানে প্রায় দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। কিছু দিনের মধ্যে নতুন প্রকল্পগুলো শুরু হলে আরও শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে।’

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই বছরে আমি ফল বিক্রির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলাম তার চেয়ে বেশি ফল উৎপাদন ও বিক্রি করে ফেলেছি। এই বছরে ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকার ফল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। ইতিমধ‌্যে প্রায় ১০ কোটি টাকার ফল বিক্রি হয়ে গেছে।’

শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবাইয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘আমরা হজরত আলীর ফল বাগানে নানাভাবে পরামর্শসহ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। তবে আমাদের ধারণাই ছিল না শেরপুরের সমতল ভূমিতে এমন ভালো মাল্টা চাষ হবে। এখানে এভাবে মাল্টাসহ অন্য ফল চাষের ফলে বিদেশি ফল আমদানি অনেকাংশেই কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া, আমরা হজরত আলীকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে অন্যান্য কৃষকদের ফল চাষে আগ্রহী করে তুলছি। আশা করি শেরপুর ফল চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *