পোশাক খাতের বিভিন্ন পণ্য রিজার্ভকে চাপে ফেলেছে

স্টাফ রিপোর্টার

বাজারে বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের জন্য প্রধানত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকেই দায়ী করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। চাপে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তবে এমন বক্তব্যের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আমদানির পরিসংখ্যানে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল ও গমের আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ১১ শতাংশ কমেছে জ্বালানি পণ্যে। সে হিসেবে গত অর্থবছরের রেকর্ড ৮৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানিতে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি পণ্যের ভূমিকা ছিল গৌণ। বরং এতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। এছাড়া লোহাসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতু, সার, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্যের রেকর্ড আমদানিও বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি বা ৬৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে (২০২১-২২) তা দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯১৬ কোটি বা ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল ছিল ২২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের। তুলা, সুতা, কাপড় (টেক্সটাইল অ্যান্ড আর্টিকেলস), কৃত্রিম তন্তু বা স্ট্যাপল ফাইবার, ডায়িং ও ট্যানিংসহ তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। এ খাতের পণ্য আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ইন্টারমিডিয়েট গুডস হিসেবে। আর ১৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারের ক্যাপিটাল গুডস বা মূলধনি পণ্য আমদানি হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক, বিভিন্ন ধরনের ইন্টারমিডিয়েট গুডস ও ক্যাপিটাল গুডস মিলিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানির ৭১ শতাংশেরও বেশি।

এ বিষয়ে ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও আমদানি-রফতানির পরিসংখ্যান তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের রেকর্ড পণ্য আমদানিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যৎসামান্য। খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি খাতে আমাদের যে পরিমাণ ব্যয় বেড়েছে, সেটি উল্লেখ করার মতো নয়। ৮৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানিতে মূল ভূমিকা রেখেছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। এ দুই খাতে আমদানির প্রভাব দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যকে ধসিয়ে দিয়েছে।

গত অর্থবছরে দেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে দেশের প্রধান রফতানি খাতটির কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৫৮ শতাংশের বেশি। তৈরি পোশাক খাতের আমদানি ও রফতানির এ ব্যবধানকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রধান উৎস হলো বৈদেশিক বাণিজ্য। আমদানি পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে কিংবা রফতানি পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে দেশ থেকে অর্থ পাচার করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল, অন্যান্য শিল্পের ইন্টারমিডিয়ারি পণ্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির যে ব্যয় দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিচ্ছবি অর্থনীতিতে দেখা যায়নি।

রেকর্ড আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে গেল কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির যে পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে সেটি অস্বাভাবিক। প্রকৃতই এ পরিমাণ পণ্য দেশে আমদানি হয়েছে কিনা সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অর্থনীতির কোনো সূচকেই এ আমদানির প্রতিফলন নেই। যে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে, সেটি দেশে এসেছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা দরকার। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ঘোষণা দিয়ে কনটেইনার ভর্তি বিদেশী মদ আনার ঘটনা এরই মধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি। যথাযথ অনুসন্ধান চালালে এ ধরনের বহু ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।

২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধান দুই খাদ্যপণ্য চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২৬৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৮৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল চাল আমদানিতে। গম আমদানিতে ব্যয় ছিল ১৮৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের চাল আমদানি ব্যয় ৫০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে গম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে চাল ও গম আমদানিতে বাংলাদেশের মোট ব্যয় হয়েছে ২৫৬ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ কম।

চাল ও গম আমদানিতে ব্যয় কমলেও গত অর্থবছরে ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যয় ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভোজ্যতেল, চিনি, দুধ, মসলা, ডাল আমদানিতে দেশের মোট ব্যয় ছিল ৪১৫ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এসব পণ্য আমদানিতে ৫৭৮ কোটি ডলার ব্যয় করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ভোজ্যতেল আমদানিতে। আগের অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে ১৯৩ কোটি ডলার ব্যয় হলেও গত অর্থবছরে ২৮৯ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। সে হিসেবে ভোজ্যতেল আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। একই সময়ে চিনি আমদানির ব্যয় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। তবে গত অর্থবছরে মসলা আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশ কমেছে।

গত এক বছরে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের জ্বালানি পণ্য আমদানি ব্যয় ১১ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় কমেছে ৬৪ শতাংশেরও বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে দেশের মোট ব্যয় ছিল ৮৯৮ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ ব্যয় ৭৯৯ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় ছিল ৯৩ কোটি ডলার। যদিও আগে এ বাবদ ২৬২ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল বাংলাদেশ। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমলেও গত অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় ছিল ৬৩৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে ৭০৬ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৩০৮ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশের মোট আমদানি ছিল ৩৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা ১৪৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে সারে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩৬ কোটি ডলারের সার আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে তা ৪৩৯ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ হিসেবে সারের আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২২৩ শতাংশ। লোহা, ইস্পাতসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতু আমদানি ব্যয়ও ৬২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারের ধাতু আমদানি হলেও গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ায় তৈরি পোশাক খাতের পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)। তিনি বলেন, তুলা, সুতা, কাপড় থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক খাতের প্রতিটি কাঁচামালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। যে পণ্যের ভাড়া এক-দেড় হাজার ডলার ছিল, সেটি এখন ৮ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এ কারণে তৈরি পোশাক খাতের পণ্য আমদানি ব্যয়ে উল্লম্ফন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেকর্ড আমদানি ব্যয় দেশের অর্থনীতিতে ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করেছে। গত অর্থবছর শেষে সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। আর ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) ঘাটতি ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছর ৯ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত ছিল বাংলাদেশের বিওপি। দেশের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। চাপের মুখে পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়নে উন্নীত হওয়া রিজার্ভের পরিমাণ ৩৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। যদিও ডলারের বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.