দুয়ার খুলছে চীন-মার্কিন এলএনজি বাণিজ্যে

একসময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানি হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) অন্যতম ক্রেতা ছিল চীন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে শুরু হওয়া বাণিজ্যযুদ্ধ দুই দেশের এলএনজি বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করে আনে। বন্ধ হয়ে যায় চীন-মার্কিন এলএনজি বাণিজ্য। তবে সময়ের ব্যবধানে এ প্রতিবন্ধকতা কাটতে শুরু করেছে। সম্প্রতি বাণিজ্যযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো এলএনজি বাণিজ্য এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করেছেন চীন ও মার্কিন জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য বিরোধ নিরসনের বন্ধুর পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর ব্লুমবার্গ ও অয়েলপ্রাইসডটকম।

সম্প্রতি চীনের ফেরান এনার্জি গ্রুপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শেনিয়ারি এনার্জি ইনকরপোরেশনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান চীনা প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে দেশটির বাজারে সব মিলিয়ে ২৬ জ্বালানিবাহী কার্গো এলএনজি রফতানি করবে। ২০২১-২০১৫ সালের মধ্যে এলএনজি নিয়ে এসব কার্গো চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাবের বাজার আদর্শ অনুযায়ী রফতানিযোগ্য এসব এলএনজির সম্ভাব্য দাম নির্ধারিত হবে। বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটাই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি চুক্তি।

ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের হাত ধরে চলা বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন এলএনজিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করে চীন। এতে চীনা জ্বালানি আমদানিকারকরা এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাজার খুঁজে নেন। তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় চীনের বাজারে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানি হয় বেশি।

বাণিজ্য খাতে দুই দেশের মধ্যকার এমন বিরোধের সূত্রপাত ২০১৮ সালে। এর পর থেকে যত দিন গেছে বিরোধ জোরালো হয়েছে। ২০১৯ সালের মে মাস নাগাদ চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের চরম আঘাত লাগে এলএনজি রফতানিতে। ওই সময় থেকে চীনের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

গত বছরের শেষ দিকে এসে বাণিজ্যযুদ্ধের লাগাম টানতে সচেষ্ট হয় উভয় দেশ। শুরু হয় ধারাবাহিক বাণিজ্য আলোচনা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো সরাতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার প্রথম পর্যায়ের চুক্তি কার্যকর হয়। এর পরও এলএনজি বাণিজ্যে গতি ফিরেনি।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে এলএনজির চালান যায়। ওই সময় চীনা আমদানিকারকরা মার্কিন এলএনজিতে বিদ্যমান শুল্ক হারে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে। তবে ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট) মাত্র নয়টি এলএনজি চালান যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে গেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ। এখন বছরের শেষভাগে এসে চীন-মার্কিন এলএনজি বাণিজ্য হারানো গতি ফিরে পেতে শুরু করেছে। শেনিয়ারি এনার্জি ইনকরপোরেশনের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আনাতোল ফেজিন বলেন, এলএনজি খাতে বড় আকারের এ চুক্তিটি বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনে সহায়ক হবে।

বাণিজ্যযুদ্ধের পাশাপাশি আরো নানা বিষয়ে চীনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চীনকে সরাসরি দায়ী করছে ওয়াশিংটন। কেননা চীনের উহান থেকে প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের বিস্তার। করোনা মহামারীতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। সংক্রমণ ও মৃত্যুতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দেশটি। এ ইস্যুতে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি বিরোধ চলছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্প বিদায় নিলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন পথে যায় সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জো বাইডেন ক্ষমতায় এলে বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনে আরো নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে পারেন। বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বাড়তি মনোযোগ দিতে পারেন বারাক ওবামার দুই মেয়াদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্রেটিক পার্টির বর্ষীয়ান রাজনীতিক বাইডেন।

এমন পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে এলএনজি বাণিজ্যের গতি ফেরাকে শুভ ইঙ্গিত বিবেচনা করা হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে চীন-মার্কিন এলএনজি বাণিজ্যের নবযাত্রা শুধু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিবেচনায় নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *