গম কূটনীতির বীজ বুনেছে রাশিয়া

স্টাফ রিপোর্ট

দুই দশক আগেও খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভর ছিল রাশিয়া। সে সময় দেশটিতে স্থানীয় চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি পূরণ করতে হতো আমদানির মাধ্যমে। বর্তমানে এ চিত্র পুরোপুরি উল্টে গিয়েছে। আমদানিকারক থেকে খাদ্যের নিট রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে দেশটি। বৈশ্বিক গম রফতানিতে রাশিয়া এখন শীর্ষে। শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রফতানিকে এখন কূটনৈতিক প্রয়োজনেও ব্যবহার করছে মস্কো। বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে মস্কোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য।

ভ্লাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন ২০০০ সালে। ক্ষমতায় এসেই রাশিয়ায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেন তিনি। রীতিমতো আগ্রাসী কায়দায় রুশ কৃষি খাতকে ঢেলে সাজান তিনি। বর্তমানে বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে পুতিনের এসব সংস্কারেরই সুবিধা নিচ্ছে রাশিয়া।

অতীতেও বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক কূটনীতিতে খাদ্যপণ্যের ব্যবহার করেছে রাশিয়া। ২০১৫ সালে তুর্কি সেনাদের হাতে রুশ জঙ্গি বিমান ভূপাতিত হওয়ার জবাবে দেশটি তুরস্কে কৃষিপণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসায় দুই বছরের মাথায় আবার আঙ্কারা ও মস্কোর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য রুশ গমের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল তুরস্ক। ক্রেমলিনও এর সুবিধা নিয়েছে পূর্ণমাত্রায়।

ইউরোপে গ্যাস রফতানির জন্য বুলগেরিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল রাশিয়া। তবে সোফিয়া তাতে রাজি হয়নি। এর পরিবর্তে তুরস্ক সে ভূমিকা পালনে সম্মত হয়। এর ধারাবাহিকতায় রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরালো হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালের মধ্যেই রুশ গমের শীর্ষ বাজারে রূপ নেয় তুরস্ক।

রাশিয়ার আরেক মিত্রদেশ ইরানের সঙ্গেও সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি গম। ২০১৮ সালে মার্কিন বিধিনিষেধ পুনর্বহালের আগ পর্যন্ত জ্বালানি তেলের বিনিময়ে পণ্য আমদানির কৌশল হাতে নিয়েছিল ইরান। সে সময় রুশ গম আমদানির শর্তে তেহরানের জ্বালানি তেল বাণিজ্যে সহায়তা করেছে মস্কো।

আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য বাজারের পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরে রাশিয়ার কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারের ব্যাপ্তি এবং এ নিয়ে উচ্চাভিলাষ—দুটোই বেড়েছে। ভৌগোলিক নৈকট্য, জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত শক্তি বিবেচনায় বর্তমানে চীনকেই রুশ খাদ্যপণ্যের ভবিষ্যৎ বড় বাজার হিসেবে দেখছে মস্কো। পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির ধারাবাহিকতায় বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে চীনে বড় একটি গ্যাস পাইপলাইন চালু রয়েছে রাশিয়ার। যদিও চীনে আমদানিতে অনুসৃত মানের কড়াকড়ি ও মহামারীর কারণে গত বছর দেশটিতে রাশিয়ার খাদ্যশস্য রফতানি কমেছে। দেশটির খাদ্যপণ্যের বাজারে রাশিয়ার অবদান এখনো তুলনামূলক কম। সামনের দিনগুলোয় এ হার আরো বাড়বে বলে আশা করছে রুশ কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এজন্য অস্ট্রেলিয়া ও ইউক্রেনের কাছ থেকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে মস্কোকে।

গমের বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রাশিয়া। বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে পণ্যটির বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য আনায় জোর দিচ্ছে মস্কো। আবার একই সঙ্গে পণ্যটির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের উত্তোলন হ্রাসজনিত ক্ষতি কাটানোরও চেষ্টা করছে রাশিয়া। তবে শুধু খাদ্য ও কৃষিপণ্য দিয়ে দেশটির জ্বালানি খাতের ক্ষতি কমানো কিছুটা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। রুশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির জিডিপিতে কৃষির অবদান মোটে ৪ শতাংশ। এর বিপরীতে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অবদান ১৫ শতাংশ। দেশটির সরকারি বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরই জোগান দেয় জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া ও অন্য উত্তোলকদের বড় ধরনের বিপাকে ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অন্য অনেক দেশের মতো রাশিয়াকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে রাশিয়া।

এর বিপরীতে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়েছে গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য। বর্তমানে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় রফতানির মাধ্যমে কৃষিপণ্যের পাওয়ার হয়ে উঠেছে রাশিয়া। বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে ক্রেমলিনের কাছে জ্বালানি তেলের বড় বিকল্প হয়ে উঠেছে খাদ্যশস্য।

তবে এ চিত্র সব সময় এমন ছিল না। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদার ১০ শতাংশ রাশিয়া একাই পূরণ করতে সক্ষম। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর খাদ্যশস্য আমদানির জন্য রাশিয়াকে এ জ্বালানি তেল বিক্রির অর্থের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গম ও খাদ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আমদানিকারক বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার ওপর আরো নির্ভরশীল করে তোলার পথ খুঁজছে রাশিয়া। এজন্য প্রয়োজনে জ্বালানি তেলের বাণিজ্যেও ছাড় দিয়েছে মস্কো।

অনেকটা নিজের ক্ষতি স্বীকার করেই সৌদি আরবসহ ওপেকভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি তেলের উত্তোলন হ্রাসে সম্মত হয়েছিল রাশিয়া। ওই সময়ে দ্রুত পতনশীল জ্বালানি তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী করে তোলাটা রিয়াদের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিএস লোম্বার্ডের বিশ্লেষক ম্যাডিনা খ্রুসতালেভা জানাচ্ছেন, ওই সময়ে জ্বালানি তেলের উত্তোলনের বিষয়টিতে ছাড় দেয়ার মাধ্যমে সৌদি আরবের খাদ্যশস্য ও কৃষিপণ্যের বড় বাজার ধরেছে রাশিয়া।

সম্প্রতি সৌদি আরবে রাশিয়ার জন্য সুযোগ আরো বেড়েছে। রিয়াদ এরই মধ্যে খাদ্যশস্য আমদানিতে নির্ধারিত মানের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরবের মোট খাদ্যশস্য আমদানিতে রাশিয়ার অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। এছাড়া চীন, ভিয়েতনামসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার মাংস রফতানি গত বছর বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। পরিমাণ ও রফতানি আয়—উভয় দিক থেকেই।

খাদ্যশস্য ও মাংস রফতানির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় রাশিয়া বর্তমানে নিজের অবস্থানকে আরো জোরালো করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পরিবহন ও অবকাঠামোগত নানা সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলোয় বর্তমানে রাশিয়ার খাদ্যপণ্য রফতানি আরো বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে গোটা বিশ্বে গমের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ রাশিয়া একাই পূরণ করছে।

এ বিষয়ে রুশ সার কোম্পানি ফোসারগোর প্রধান নির্বাহী আন্দ্রেই গুরিয়েভের মূল্যায়ন হলো, বিশ্ব এখন রাশিয়ার কাছ থেকে শুধু জ্বালানি তেল আর কালাশনিকভই পাচ্ছে না, একই সঙ্গে সবুজ ভূমি (সার) ও পরিচ্ছন্ন খাদ্যের নিশ্চয়তাও পাচ্ছে।

সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে তার এ মন্তব্য প্রকাশ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *