কৃষিখাতে প্রণোদনা তিন হাজার কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্ট

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট মোকাবিলায় কৃষিখাতের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ তহবিল থেকে সহজ শর্তে ৪ শতাংশ সুদহারে ঋণ নিতে পারবেন কৃষক।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ স্কিম গঠন ও পরিচালনার নীতিমালাবিষয়ক নির্দেশনা দিয়ে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বরাবর পাঠিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট মোকাবিলায় দেশের কৃষিখাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কৃষি কর্মকাণ্ড অধিকতর গতিশীল করার লক্ষ্যে কৃষির বিভিন্ন খাতে স্বল্প সুদে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে এর আগে গৃহীত বিভিন্ন প্রণোদনামূলক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় কৃষিখাতের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত এ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের নাম কৃষিখাতে বিশেষ প্রণোদনামূলক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম (দ্বিতীয় পর্যায়)। স্কিমের আওতায় তহবিলের পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা। যার মেয়াদ হবে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

ঋণ চুক্তি সম্পাদন ও তহবিল বরাদ্দ

পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ঋণ সুবিধা প্রাপ্তির লক্ষ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার আওতাভুক্ত ব্যাংকসমূহের মধ্যে ইচ্ছুক ব্যাংকসমূহকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি করতে হবে। ব্যাংকসমূহের কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা, ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ইত্যাদির ভিত্তিতে কৃষিঋণ বিভাগ কর্তৃক ব্যাংকসমূহের অনুকূলে তহবিল বরাদ্দ করা হবে।

অংশগ্রহণকারী ব্যাংক কর্তৃক এ স্কিমের আওতায় বিভিন্ন সময়ে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা পর্যালাচোনান্তে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে প্রয়োজনবোধে বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ পুনঃনির্ধারণ করতে পারবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের পর পেশকৃত পুনঃঅর্থায়ন দাবি পর্যালোচনাপূর্বক পর্যায়ক্রমে বরাদ্দকৃত তহবিলের সমপরিমাণ অর্থায়ন করা হবে।

কৃষক বা প্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ
এ স্কিমের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকসমূহকে নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালার আওতাভুক্ত খাতসমূহে কৃষক/গ্রাহককে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক নিজ ব্যাংক হতে প্রদত্ত বিদ্যমান ঋণ সুবিধার অতিরিক্ত ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ (সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা) এ স্কিমের আওতায় বিতরণ করতে পারবে। নতুন গ্রাহক ঋণের সর্বোচ্চ পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে নির্ধারণপূর্বক এ স্কিমের আওতায় বিতরণ করতে পারবে।

ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের অনুকূলে শস্য/ফসল চাষের জন্য এককভাবে জামানতবিহীন (শুধুমাত্র ফসল দায়বন্ধনের বিপরীতে) সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা যাবে। গৃহস্থলী পর্যায়ে গাভী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ খাতে ব্যক্তিগত গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। শস্য ও ফসল ঋণ ব্যতীত অন্যান্য খাতের ঋণসমূহের ক্ষেত্রে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যূনতম জামানত বা সহায়ক জামানত গ্রহণের বিষয়ে ব্যাংক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে।

এ স্কিমের আওতায় গৃহীত ঋণ কোনোভাবেই গ্রাহকের পুরাতন ঋণ সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। কোনো গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ খেলাপি হলে তিনি এ স্কিমের আওতায় ঋণ প্রাপ্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।

সুদহার
এ স্কিমের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকসমূহ বাংলাদেশ ব্যাংক হতে নির্ধারিত ১ শতাংশ সুদহারে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ (সরল হারে)। এ সুদহার নতুন ও পুরাতন সব গ্রাহকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

ঋণের খাতসমূহ
কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত শস্য ও ফসল খাতের আওতাভুক্ত দানা শস্য, অর্থকারি ফসল, শাক-সবজি, ফল-ফুল চাষ, মাছ চাষ, পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাত, কৃষি ও সেচ যন্ত্রপাতি, বীজ উৎপাদন খাতসমূহে ঋণ বিতরণ করা যাবে। ব্যাংকের অনুকূলে বরাদ্দকৃত তহবিলের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শস্য ও ফসল খাতে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।

ঋণের মেয়াদ
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকসমূহ পুনঃঅর্থায়ন গ্রহণের তারিখ হতে অনধিক ১৮ মাসের (১২ মাস এবং গ্রেস পিরিয়ড ৬ মাস) মধ্যে আসল এবং সুদ বা মুনাফা (বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ১ শতাংশ সুদহারে) পরিশোধ করবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে শস্য খাতে বিতরণকৃত ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১২ মাস। এছাড়া অন্যান্য খাতে বিতরণকৃত ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ন্যূনতম তিন মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৮ মাস।

আবেদন পদ্ধতি
কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ শুরু করার পর অংশগ্রহণকারী ব্যাংক কর্তৃক মাসিক ভিত্তিতে পুনঃঅর্থায়ন দাবি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক হতে পুনঃঅর্থায়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে নিম্লোক্ত প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজপত্রসহ মহাব্যবস্থাপক, কৃষিঋণ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট পুনঃঅর্থায়ন দাবি করবে।

যা প্রয়োজন
প্রকৃত বিতরণ সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র, বিতরণকৃত ঋণের সমন্বিত বিবরণী, ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতিপত্র (ডিপি নোট) ও লেটার অব কমিউনিটি, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য প্রয়োজন হবে।

পরিশোধ পদ্ধতি
বিভিন্ন দফায় ব্যাংকের অনুকূলে ছাড়কৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট দফার মেয়াদপূর্তির মধ্যেই মুনাফাসহ গৃহীত আসলের সমুদয় অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণকৃত ঋণ আদায়ের সব দায়-দায়িত্ব ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত থাকবে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ আদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনাকে সম্পর্কিত করা যাবে না।

ঋণের বকেয়া নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পরিশোধিত না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রক্ষিত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব বিকলন করে তা আদায় বা সমন্বয় করা হবে। স্কিমের আওতায় প্রদত্ত ঋণের অর্থ বা এর কোনো অংশের সদ্ব্যবহার হয়নি মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট প্রতীয়মান হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সেই পরিমাণ অর্থের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে সুদ ধার্যপূর্বক এককালীন আদায় করা হবে।

মনিটরিং
এ স্কিমের আওতায় বিতরণকৃত প্রতিটি ঋণের জন্য পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক হতে অর্থায়ন প্রাপ্তির পর নিবিড় মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে ঋণ বিতরণের বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগে পাক্ষিক ভিত্তিতে দাখিল করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে সরেজমিনে পরিদর্শন এবং তথ্যাদি যাচাইয়ের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সদ্ব্যবহার মনিটরিং এবং মূল্যায়ন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *