ঊর্ধ্বমুখী গম ও ভুট্টার দাম

স্টাফ রিপোর্টার

গম ও ভুট্টার ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে এশিয়ায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে চালের বাজার। সম্প্রতি পশুখাদ্যের জন্য ব্যবহূত নিম্নমানের চালের চাহিদাও বেড়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ঠিক এমন সময়ই বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হিসেবে বিবেচিত চালের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এতে করে অঞ্চলটিতে খাদ্যপণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। খবর রয়টার্স।

বাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, বৈশ্বিক গম রফতানির ২৫ শতাংশই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। মোট বৈশ্বিক ভুট্টা রফতানির ১৬ শতাংশ আসে দেশ দুটি থেকে। গত মাসে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে খাদ্যশস্য দুটির সরবরাহ বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়। এর পর থেকেই বৈশ্বিক আমদানিকারকরা সরবরাহ নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ইউক্রেনে আগ্রাসী নীতির কারণে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কয়েক ধাপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশটির পণ্য রফতানি। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন দেশটির সব সমুদ্রবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে। এসব কারণে শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে গত সপ্তাহে গমের দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এক দশকের সর্বোচ্চে উঠে এসেছে ভুট্টার বাজারদর।

ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় পশুখাদ্যের বাজার চীনসহ অন্যান্য ক্রেতা দেশ গম ও ভুট্টার ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিকল্প খুঁজছে। এক্ষেত্রে আমদানিকারকরা ভাঙা চালকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। মিলে মাড়াইয়ের সময় ভেঙে যাওয়ায় নিম্নমানের হয়ে থাকে এ চাল।

চাল সাধারণত গমের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যেই বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু এক মাস আগে গমের মূল্য ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে পণ্য দুটির দামের ব্যবধান অনেকটাই কমে গেছে। এমনকি কিছু নিম্নমানের চালের তুলনায় গম ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

থাইল্যান্ডে রফতানিযোগ্য খাদ্য মানসমৃদ্ধ চালের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে আড়াই বছরের সর্বোচ্চে উঠেছে। মূলত খাদ্যপণ্য ও পশুখাদ্যের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণেই রফতানিকারকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সর্বশেষ থাই চালের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪২১ ডলার ৫০ সেন্টে স্থির হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে আমদানি-রফতানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকলে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু থাইল্যান্ড নয়, ভারত ও ভিয়েতনামেও রফতানিযোগ্য চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার (এফএও) চালের বাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ শার্লি মুস্তাফা বলেন, গম ও ভুট্টার বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে পশুখাদ্য হিসেবে ভাঙা চালের চাহিদা অনন্য উচ্চতা পৌঁছবে। শুধু পশুখাদ্যই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও শস্যটির ব্যবহার বাড়বে। বিশেষ করে চালকে নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় রাখা মানুষের সংখ্যা অন্য যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বেইজিংভিত্তিক চাল ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি বছরের জন্য চীন ইউক্রেনের সঙ্গে ২০ লাখ টন ভুট্টা আমদানির চুক্তি করেছে। কিন্তু দেশটির লজিস্টিক চেইনে সংকটের কারণে শস্যগুলোর বেশির ভাগ চালানই আটকে আছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চীন ৩০ লাখ টন ভাঙা চাল আমদানির কথা ভাবছে। অথচ দুই বছর ধরে দেশটি বছরে ২০ লাখ টনের বেশি ভাঙা চাল আমদানি করেনি।

অন্য একটি সূত্র জানায়, চীনের গোয়াংডং প্রদেশের এক আমদানিকারক থাইল্যান্ড থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অন্য আমদানিকারকরা পশুখাদ্যে জোগান দিতে সম্প্রতি ভারত থেকে ভাঙা চাল কিনেছে।

ভারতের রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বি ভি কৃষ্ণ রাও বলেন, ভুট্টার ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে ভারতীয় ভাঙা চালের চাহিদা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভুট্টার জায়গায় চালকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করছেন।

তিনি জানান, চলতি মাসে শতভাগ ভারতীয় ভাঙা চালের দাম বেড়ে টনপ্রতি ৩২০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অথচ গত মাসে এ চালের দাম ছিল টনপ্রতি ২৯০ ডলার।

ভুট্টার অতিরিক্ত দামের কারণে থাইল্যান্ডের পশুখাদ্য উৎপাদকরাও চালকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়ার কথা ভাবছেন। এদিকে পশুখাদ্য হিসেবে ভারত সবচেয়ে বেশি গম ব্যবহার করে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে শস্যটির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভারতও চাল ব্যবহার বাড়াতে পারে। এমনটি ঘটলে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চালের বৈশ্বিক বাজারদর আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.