শীর্ষ ২০ গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায় বাড়াতে তাগিদ

0
9
বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক

শীর্ষ ২০ গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ আদায় বাড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেসঙ্গে বড় গ্রাহকদের ঢালাওভাবে ঋণ দেয়ার ব্যাপারেও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে গভর্নর ফজলে কবিরের এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) লক্ষ্যমাত্রাগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে সবক’টি ব্যাংকেরই দৈন্যদশা ফুটে উঠেছে। বৈঠকে ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেসঙ্গে ঋণ বিকেন্দ্রীকরণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের সঙ্গে প্রতি বছরই এমওইউ স্বাক্ষর করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে স্মারক অনুযায়ী এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রবৃদ্ধি যথাযথ রাখা, লোকসানি শাখা ও পরিচালন ব্যয় কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সুপারভিশনের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলো সমঝোতা স্মারকের সিংহভাগ লক্ষ্য অর্জন ও শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হচ্ছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে নির্ধারণ করে দেয়া লক্ষ্যমাত্রার ১০ শতাংশও পূরণ করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। উল্টো বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বেড়ে গেছে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও লোকসানি শাখার সংখ্যা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় কমে গেছে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফাও। ঋণের বিকেন্দ্রীকরণের কথা থাকলেও শীর্ষ গ্রাহকদের কাছে আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে ঋণ। এ পরিস্থিতিতে গতকালের বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এমওইউ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত এ চার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কথা। কিন্তু গত এক বছরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ শতাংশ। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুনে ছিল ২২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। জুন পর্যন্ত পরিচালন লোকসানে রয়েছে চারটি ব্যাংকের ৫৩৩টি শাখা। যদিও এমওইউ অনুযায়ী লোকসানি শাখার সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ থেকে আদায় করেছে ৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। যদিও এক্ষেত্রে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দ্বিগুণ।দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে। এর বিপরীতে ঋণ বিতরণ করেছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে ব্যাংকটির আমানতের ৬৩ শতাংশই অলস পড়ে আছে। অন্যদিকে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা, যদিও গত বছরের জুনে খেলাপি ঋণের এ পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে ব্যাংকটির পরিচালনায় ৩৪৭ কোটি টাকা লোকসান হলেও চলতি বছর ২৪৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির লোকসানি শাখা দাঁড়িয়েছে ২৮৫টি।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সমঝোতা স্মারকের আলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। তবে অতীতের বিপর্যয় থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। চলতি বছরের প্রথমার্ধে সোনালী ব্যাংক ২৪৮ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। গতকালের বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রতি বেশকিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আমরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কিছু প্রস্তাব রেখেছি। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

চলতি বছরের জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে এ সময়ে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ১০৫ কোটি থেকে বেড়ে ৩০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক জুন পর্যন্ত ৫১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করেছে এবং ঋণ বিতরণ করেছে ২৮ হাজার ৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ১১৬টি শাখা জুন পর্যন্ত লোকসানে রয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম বলেন, এমওইউর আলোকে আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলা যাবে না। তবে অগ্রণী ব্যাংক বেশ কয়েকটি সূচকে ভালো করেছে। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বছর শেষে আমরা শক্তিশালী একটি ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারব। গতকালের বৈঠক থেকে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বেশকিছু দিকনির্দেশনা পেয়েছি।

রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে জনতা ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। তবে খেলাপি গ্রাহকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত মানে ঋণ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকটি। ব্যাংকটির লোকসানি শাখার সংখ্যা ৫৮।

মামলাভুক্ত ঋণ খেলাপির তালিকায় যুক্ত হওয়ায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশ। এটি গত বছরের জুনে ছিল ২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। তবে চলতি বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। কমেছে লোকসানি শাখার সংখ্যা।

এ বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের এমডি মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেয়া হয়েছে। তার ধারাবাহিকতায় গতকালের বৈঠকেও খেলাপি ঋণ আদায়ে তাগিদ দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ যাতে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। রিটভুক্ত ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নতুন নির্দেশনার কারণে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। গত বছরসহ চলতি বছরে দেয়া কোনো ঋণই এখনো খেলাপি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

গতকালের বৈঠকে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, এস কে সুর চৌধুরী ও এস এম মনিরুজ্জামান, ব্যাংকগুলোয় নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, এ চার ব্যাংকের সঙ্গে এটি মূলত সমঝোতা চুক্তি বা এমওইউর নিয়মিত বৈঠক। এমওইউর আলোকে জুনভিত্তিক পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এ বৈঠক হয়েছে। বৈঠক থেকে ব্যাংকগুলোর প্রতি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

উত্তর দিন