যেসব বিনিময়ে বান্দার গুনাহ মাফ হয়

স্টাফ রিপোর্টার

মানুষ মাত্রই গুনাহ বা পাপ করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে মানুষকে গুনাহ থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। এমনকি মানুষের প্রতি যখন কোনো বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যধি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ-কষ্ট কিংবা শরীরের কোথাও সামান্য কাঁটাও ফুটে তাতে তাদের জীবনের গুনাহ মাফ করে দেন। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে গুনাহ মাফ সম্পর্কে কী বলেছেন?

হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন উসিলায় গুনাহ থেকে মুক্তি দেবেন। হাদিসের একাধিক বর্ণনা থেকে প্রমাণিত যে, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-ব্যাধিসহ যে কোনো দুশ্চিন্তা-ভাবনায়ও গুনাহ মাফ হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক হাদিসে তা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন-
১. হজরত আবু সাঈদ খুদরি ও আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুসলমানের প্রতি যখন কোনো বিপদ, কোনো রোগ, কোনো ভাবনা, কোনো চিন্তা, কোনো কষ্ট বা কোনো দুঃখ পৌঁছে; এমনকি তার শরীরে কোনো কাঁটা ফুটলেও তাদ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

২. হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ যার ভালো চান তাকে বিপদগ্রস্ত করেন।’ (বুখারি)

৩. হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বললেন, হ্যাঁ! তোমাদের দুইজনের সমপরিমাণ জ্বর আমার হয়। আমি বললাম, আপনারা তো দ্বিগুণ নেকি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ’ আসল কারণ তাই।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কোনো মুসলিমের প্রতি যে কোনো কষ্ট আসুক না কেন, চাই সেটা অসুস্থতা বা অন্য কিছুই হোক। আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা গুনাহসমূহ ঝেড়ে দেন; যেমনিভাবে গাছ তার পাতা ঝেড়ে ফেলে।’ (বুখারি, মুসলিম)

৪. হজরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মু সায়িব এর কাছে গেলেন এবং বললেন- তোমার কি হয়েছে; কাঁদছো কেন? তিনি বললেন, জ্বর; আল্লাহ তাআলা তা ভাল না করুন!
একথা শুনে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে গালি দিও না। কেননা তা আদম সন্তানের গুনাহসমূহকে দূর করে দেয়, যেভাবে হাপর লোহার মরিচা দূর করে।’ (মুসলিম)

বিপদ-আপদ দ্বারাই আল্লাহ তাআলা বান্দাকে পরীক্ষা করেন। যারা এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে তারাই সফলতা পায়। আর এর বিনিময়তো আরও চমৎকার। হাদিসে পাকে এসেছে-
৫. হজরত মুসআব ইবনু সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাবা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন- আমি বললাম হে আল্লাহর রাসুল! বিপদ দ্বারা সর্বাপেক্ষা পরীক্ষা করা হয় কাদের? নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘নবিদের। এরপর তাঁদের তুলনায় যারা অপেক্ষাকৃত কম উত্তম তাদেরকে। মানুষ তার দ্বীনদারীর অনুপাতে বিপদগ্রস্ত হয়।
যদি সে তার দ্বীনের ব্যাপারে শক্ত হয় তবে তার বিপদও শক্ত হয়ে থাকে। আর যদি তার দ্বীনের ব্যাপারে তার শিথিলতা থাকে, তবে তার বিপদও শিথিল হয়ে থাকে। তার এমন বিপদ হতে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত সে পৃথিবীতে চলাফেরা করে অথচ তার কোনো গুনাহ থাকে না।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, দারেমি, ইবনে হিব্বান)

রোগ-ব্যাধি মুমিন বান্দাকে গুনাহমুক্ত করে দেয়। কারণ মুমিন বান্দার জীবনে কোনো না কোনো বিপদ-আপদ লেগেই থাকে যার ফল যেস গুনাহমুক্ত হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে-
৬. হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর বিপদ লেগেই থাকে। (যেমন) তার নিজের শরীরে, তার ধন-সম্পদে কিংবা তার সন্তানদের ব্যাপারে। যতক্ষণ না সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। আর তখন তো তার উপর কোনো গুনাহের বোঝাই থাকে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, মুসতাদরাকে হাকেম, বায়হাকি)

এ কারণেই পরকালে দুনিয়ার সুখ-শান্তি ভোগকারীরা আক্ষেপ করবে। তারা বিপদগ্রস্ত লোকদের সাওয়াব প্রাপ্তি দেখে আফসোস করবে। আর বলবে-
৭. হজরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (দুনিয়াতে) সুখ-শান্তি ভোগকারী ব্যক্তিরা যখন কেয়ামতের দিন দেখবে যে, (দুনিয়ার) বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাওয়াব দেওয়া হচ্ছে। তখন তারা আক্ষেপ করবে, আহ! দুনিয়াতে যদি তাদের চামড়া কাঁচি দিয়ে কেঁটে ফেলতো!’ (তিরমিজি, মেশকাত)

সুতরাং দুনিয়ায় বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যাধি, দুঃখ-কষ্টে ভয় না পেয়ে কিংবা অভিশাপ মনে না করে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি সাহায্য চাওয়ার বিকল্প নেই। হতে পারে দুনিয়ার এসব বিপদ-আপদই পরকালের মুক্তির উপায় ও দুনিয়ার গুনাহ মাফের একমাত্র কারণ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মহাকে যে কোনো বিপদ-আপদ, রোগ-ব্যধি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ-কষ্ট কিংবা শরীরের কোথাও সামান্য কাঁটাও ফুটলেও তাতে ধৈর্যধারণ করার তাওফিক দান করুন। হাদিসের উপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। হাদিসে ঘোষিত ফজিলত পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

YouTube
Pinterest
LinkedIn
Share
Instagram
WhatsApp
FbMessenger
Tiktok