বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রসপেক্টাস তৈরি করছে ওয়াইম্যাক্স

0
7
ওয়াইম্যাক্স
ওয়াইম্যাক্স

বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে প্রসপেক্টাস তৈরি করে শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করছে ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোড লিমিটেড। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটি এ সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যে কারণে ওয়াইম্যাক্সের প্রসপেক্টাসে বিভ্রান্তিকর ও গোঁজামিল তথ্য দেয়ার প্রমাণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কাছে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। উল্টো বিএসইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন আইপিও অনুমোদন হওয়ার পর প্রসপেক্টাসে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে কিছু করার নেই।

বিএসইসি’র কাছে জমা দেয়া ওয়াইম্যাক্সের প্রসপেক্টাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) এবং কর সমন্বয়ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি একেক স্থানে একেক রকম তথ্য দিয়েছে। সেই সঙ্গে রিটার্ন অন ইক্যুইটি ভুলভাবে দেখা হয়েছে। হিসাব মান লঙ্ঘন করে সম্পদ ও মুনাফার পরিমাণ বেশি দেখানো হয়েছে।

সে সময় বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, ওয়াইম্যাক্সের প্রসপেক্টাসে আর্থিক তথ্যের বিষয়ে কোনো অনিয়ম করা হলে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এরপর প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং বিএসইসির অনুমোদন নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আইপিও’র মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলন শুরু করে দিয়েছে ওয়াইম্যাক্স। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির আইপিও আবেদন শেষ হবে।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে পক্ষ থেকে সাইফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোয়ারি (অনিয়মের তথ্যের বিষয়ে অবহিত করা) দিতে হবে আইপিও অনুমোদনের আগে। আইপিও অনুমোদনের পর কোয়ারি দিয়ে কোনো লাভ নেই।

বিষয়টি নিয়ে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আইপিও অনুমোদনের পর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, বিএসইসির এমন মন্তব্য কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইপিও অনুমোদন দেয় বিএসইসি, সুতরাং প্রসপেক্টাসে কোনো অনিয়ম করা হলে অবশ্যই বিএসইসিকে ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ওয়াইম্যাক্সের প্রসপেক্টাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রসপেক্টাসের ১২৫ পৃষ্টায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বেসিক ইপিএস দেখিয়েছে ২ টাকা ৪৪ পয়সা। একই ইপিএস দেখানো হয়েছে ২৮ নম্বর নোটে। তবে ১৫৮ পৃষ্ঠায় বেসিক ইপিএস হিসাবে দেখানো হয়েছে ২ টাকা ১৯ পয়সা। অর্থাৎ দুই স্থানের ইপিএস’র মধ্যে ২৫ পয়সার ব্যবধান রয়েছে।

আবার ১৫৮ পৃষ্ঠায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও ইপিএস ভুলভাবে দেখানো হয়েছে। এই অর্থবছরটিতে শেয়ার ওয়েটেড না করেই ইপিএস দেখানো হয়েছে। ফলে যেখানে ইপিএস ১৬৫ টাকা ৬৮ পয়সা হওয়ার কথা তা দেখানো হয়েছে ১১৮ টাকা ৭৪ পয়সা।

এ দিকে ভুল রিটার্ন অন ইক্যুইটি দেখিয়ে আসছে ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোড। নিয়ম অনুযায়ী মুনাফাকে গড় ইক্যুইটি দিয়ে ভাগ করে রিটার্ন অন ইক্যুইটি দেখাতে হয়। কিন্তু ওয়াইম্যাক্স কর্তৃপক্ষ বছর শেষের ইক্যুইটি দিয়ে রিটার্ন অন ইক্যুইটি নির্ণয় করে। যা প্রকৃত চিত্র দেখায় না।

প্রতিষ্ঠানটির কর সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রসপেক্টাসের ৭.০২ নম্বর নোটে অগ্রিম করের সঙ্গে ৪১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা সমন্বয় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১৭.০১ নম্বর নোটে সমন্বয় দেখানো হয়েছে ৩৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। বাকি ৫ লাখ টাকা নগদ প্রদান করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ হিসাবে অগ্রিম কর সমন্বয় ও করবাবদ নগদ প্রদান নিয়ে দুই রকম তথ্য দেয়া হয়েছে।

এদিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কর বাবদ ৪১ লাখ ৭৩ হাজর টাকা অগ্রিমের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। যাতে একই পরিমাণ অগ্রিম কর প্রদান বাবদ সম্পদ ও সঞ্চয় বাবদ দায় কমেছে। তবে নগদ প্রবাহ অনুযায়ী এ বছর ৪১ লাখ ৭৩ হাজার টাকার কর প্রদান করা হলেও শুধুমাত্র অগ্রিম কর হিসাবে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা প্রদান দেখানো হয়েছে। বাকি ২৮ লাখ ২০ হাজার টাকার কোনো হিসাব নেই।

বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (বিএএস)-১৬ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল থাকা সম্পত্তি প্রাচীর, ফ্যাক্টরির ভেতরে রাস্তা, পার্কিং প্লেস, বাগান ইত্যাদি ল্যান্ড ডেভলপমেন্ট অবচয়যোগ্য সম্পদ। কিন্তু ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোড ল্যান্ড ডেভলপমেন্টের ওপর অবচয় চার্জ করেনি। এর মাধ্যমে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দখানো হয়েছে।

এদিকে বিএএস-১২ অনুযায়ী, প্রযোজ্য হলেও ২০১৪ সাল পর্যন্ত ডেফার্ড টেক্স গণনা করেনি ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস। এমনকি ডেফার্ড ট্যাক্স বাবদ পরবর্তীতে সমন্বয়ও করা হয়নি। এতে বর্তমানে নীট সম্পদের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ী, নোট ২৮-এ ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস কর্তৃপক্ষ ওয়েটেড শেয়ার দিয়ে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রিস্টেড শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) দেখিয়েছে। তবে রিস্টেড ইপিএস বলতে মোট শেয়ার দিয়ে মুনাফাকে ভাগ করে হিসাব করাকে বোঝানো হয়। ওয়েটেড শেয়ার দিয়ে রিস্টেড ইপিএস দেখানোর মাধ্যমে বেশি দেখানো হয়েছে।

এ দিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৫) ভুল শেয়ার প্রতি মুনাফা দেখিয়েছে ওয়াইম্যাক্স। এ সময় ইপিএস ৯৩ পয়সার বদলে ৫৩ পয়সা দেখানো হয়েছে। বিএএস-৩৩ অনুযায়ী, শেয়ার ওয়েটেড না করে এ ভুল ইপিএস দেখানো হয়েছে।

বিএএস অনুযায়ী, প্রিফারেন্স শেয়ার ও অন্যান্য বিষয় যখন কমন বা সাধারণ শেয়ারে রুপান্তর হয়, তখন ডাইলুটেড ইপিএস গণনা করতে হয়। এ জাতীয় কোনো কিছু না ঘটায় ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডসে ডাইলুটেড ইপিএস গণনা প্রযোজ্য নয়। তবে কোম্পানিতে ডাইলুটেড ইপিএস এপলিকেবল বলে প্রসপেক্টাসের ১৩৮ পৃষ্টায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৮ পৃষ্টায় ডাইলুটেড বলে ভুল ইপিএস দেখানো হয়েছে।

উত্তর দিন