বিদ্যুতের মূল্য ডলারে পরিশোধে চাপে পিডিবি

0
2
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড

বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে ডলারে মূল্য পরিশোধ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এ খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে সেভাবেই। কিন্তু ডলারের চাঙ্গাভাব বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে বাড়তি চাপ তৈরি করছে বিপিডিবির ওপর। টাকার বিপরীতে ডলার ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠায় বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে বেশি অর্থ বয় করতে হচ্ছে। যদিও বিপিডিবির দাবি, ডলারের মূল্যের ওঠানামার প্রভাব খুব একটা পড়বে না প্রতিষ্ঠানটির ওপর।

অনেক দিন ধরেই টাকার বিপরীতে ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই গত এক বছরে ডলারের দাম আড়াই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গত সপ্তাহেও ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রতি ডলারের বিক্রয়মূল্য ৮৪ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পরে দাম খানিকটা কমে আসে। গতকাল আন্তঃব্যাংকে ডলার লেনদেন হয় ৮১ টাকা ৯৫ পয়সায়। আর বিক্রি হয় ৮২ টাকা ৯৫ পয়সায়। খোলাবাজারে বিক্রি হয় আরো বেশি দামে, প্রায় ৮৫ টাকায়।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে উৎপাদনে রয়েছে বেসরকারি খাতের অর্ধশতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রই রয়েছে ১৮টি। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে এগ্রিকোর রয়েছে পাঁচটি। দুটি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের। একটি করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ম্যাক্স পাওয়ার, দেশ এনার্জি, আইইএল পাওয়ার, সামিট পাওয়ার, পাওয়ারপ্যাক, একম, ইউনাইটেড, কেপিইএল, খানজাহান পাওয়ার, নর্দান পাওয়ার ও আমনুরা পাওয়ারের। এর বাইরে রয়েছে রেন্টাল ও ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি)।

এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী, ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধযোগ্য অর্থের ৮০ শতাংশ ডলারে দেয় বিপিডিবি। বাকি অর্থ পরিশোধ করা হয় স্থানীয় মুদ্রায়। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের আমদানিবাবদ অর্থও ডলারের পরিশোধ করা হয়।

বেসরকারি খাতের ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বারাকা পাওয়ারের পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয়বাবদ বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিদেশী মুদ্রায় অর্থ পরিশোধে চুক্তি করেছে বিপিডিবি। মূলত বিদ্যুৎ খাতে বিদেশী ঋণ উত্সাহিত করতে এক দশক ধরে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর রয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি, তেলের মূল্য ও বিদেশী ঋণের অর্থ পরিশোধের জন্য ডলার প্রয়োজন। এজন্যই উদ্যোক্তাদের ডলারের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে বিপিডিবি।

বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানকালীনই ডলারের মূল্য ধরে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ডলারের চলতি বাজারদর অনুযায়ী মূল্য পরিশোধের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বশেষ মাসের বিদ্যুতের দাম পরিশোধ হয় চলতি মাসের ডলারের বিনিময় হার অনুযায়ী। বিপিডিবির হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়বাবদ ১৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা মূল্য পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থবছরটিতে প্রতি ডলারের মূল্য ছিল সাড়ে ৭৮ থেকে প্রায় সাড়ে ৮১ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮৩ টাকা। অর্থাৎ ডলারের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে বিপিডিবিকে।

যদিও ডলারের মূল্যের ওঠানামার প্রভাব খুব একটা পড়বে না বলে দাবি করেন বিপিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ক্রয়ের মূল্য বৈদেশিক মুদ্রায়, বিশেষত ডলারে নির্ধারণ করা হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানি ও বিদেশী ঋণের অর্থ পরিশোধের জন্য চুক্তিতে ডলারের ভিত্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বিপিডিবির আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা সামান্যই।

চুক্তি অনুযায়ী বিপিডিবি ডলারে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করলেও বিশ্বের অনেক দেশই বিদ্যুৎ ক্রয়ে স্থানীয় মুদ্রাকে উত্সাহিত করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্থাপিত কেন্দ্র থেকে দেশটির সরকার বিদ্যুৎ কেনে রুপিতে। ২০০৬ সালে গুজরাট উর্যা বিকাশ নিগম লিমিটেড আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড, জিন্দাল পাওয়ার লিমিটেড ও পাওয়ার ট্রেডিং করপোরেশনকে (পিটিসি) প্রতি ইউনিট ৩ রুপি ২৪ পয়সা দরে মোট ১ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়। একই সময়ে গুজরাট রাজ্য সরকার আদানি এন্টারপ্রাইজেসের কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি ৫ রুপি ৩১ থেকে ৫ রুপি ৪৫ পয়সা দরে মার্চেন্ট পাওয়ারও ক্রয় করছিল। সে বছরের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত মার্চেন্ট পাওয়ারের মূল্যবাবদ গুজরাট রাজ্য সরকার আদানি এন্টারপ্রাইজেসকে ৩২২ কোটি রুপি পরিশোধ করে। পুরো মূল্যই পরিশোধ করা হয় স্থানীয় মুদ্রায়। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া সরকার দেশটিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে রুপিয়াহ বাধ্যতামূলক করেছে।

ডলারে বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিষয়টি আগেই মীমাংসিত বলে জানান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশ আমদানিবাবদ ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয় উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে নেয়া ঋণের অর্থ পরিশোধেও ডলার প্রয়োজন হয়। তাদের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তিও করা হয় সেভাবেই।

বেসরকারি খাতের কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ে এমনিতেই লোকসান করছে বিপিডিবি। প্রতি বছরই ভারী হচ্ছে লোকসানের পাল্লা। বিদ্যুৎ ক্রয়বাবদই চলে যাচ্ছে সংস্থাটির পরিচালন ব্যয়ের সিংহভাগ। বর্তমানে বিপিডিবির মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ যাচ্ছে বেসরকারি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে। তেজি ডলারে মূল্য পরিশোধ এ চাপ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্যারিফ ঘাটতি মেটাতে নেয়া ঋণ ৩৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। আর ঋণের বিপরীতে সুদবাবদ দায় আরো ৪ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

ঊর্ধ্বমুখী ডলারে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধের কারণে বিপিডিবির লোকসান আরো বাড়বে বলে জানান কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, এমনিতেই বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান আরো বেশি লাভবান হবে। পাশাপাশি লোকসান বাড়বে বিপিডিবির।

উত্তর দিন