টাকা না দিয়েই শাখা বন্ধ করছে গোল্ডেন লাইফ

0
3
গোল্ডেন লাইফ
গোল্ডেন লাইফ

বীমা কোম্পানি হিসেবে ১৯৯৯ সালে লাইসেন্স পায় গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এর পরের বছর থেকেই কুষ্টিয়া জেলার সাত উপজেলায় ব্যবসা শুরু করে বীমা কোম্পানিটি। প্রতিষ্ঠানটিতে বীমা পলিসিও খোলেন অনেকে। কিন্তু এসব পলিসির মেয়াদ পূরণের পর মুনাফার অর্থ পাওয়া দূরের কথা, জমানো টাকাও ফেরত পাননি এ অঞ্চলের কোনো কোনো গ্রাহক। গত ১৭ বছরে কুষ্টিয়ার শাখাগুলো থেকে প্রিমিয়াম হিসেবে ১০ কোটি টাকার বেশি আদায় করেছে বীমা কোম্পানিটি। কিন্তু গ্রাহকদের জমানো এ অর্থ ফেরত না দিয়েই কুষ্টিয়ার শাখাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

কুষ্টিয়া ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে গোল্ডেন লাইফের বিরুদ্ধে। দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত এসব গ্রাহকের কেউ কেউ মামলা করলেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছেন আড়ালে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, মামলা করলে টাকা আদায় হয়, নয়তো কোম্পানিই উধাও হয়ে যায়। এমনকি যেসব কর্মকর্তা বীমা করিয়েছিলেন, তাদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিরীক্ষায়ও কোম্পানিটির বিভিন্ন অনিয়ম একাধিকবার প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু কোনো এক রহস্যজনক কারণে এর পরও আইনি পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মালিকপক্ষের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার গাফিলতির কারণে ক্রমেই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

বীমা কোম্পানিটির গ্রামীণ শাখাগুলোর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএর কাছেও। কারণ এসব শাখার অনেকগুলোর ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন নেয়া হয়নি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুমোদনহীন শাখা খুলে ব্যবসা শুরুর প্রথম থেকেই প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। যাচাই-বাছাই না করে নামসর্বস্ব কোম্পানিটিতে বীমা করার কারণে শেষ সঞ্চয়টুকু খুইয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৫ লাখেরও বেশি গ্রাহক। ক্ষুদ্র বীমার আওতাধীন এসব গ্রাহকের অধিকাংশই গরিব ও নিম্নবিত্ত। তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়েই রাজধানীর তেজগাঁওয়ে গড়ে উঠেছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিলাসবহুল কার্যালয়।

জানা গেছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার এক গ্রাহকের দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও কোম্পানির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (অর্থ ও হিসাব) ফিরোজ আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এর আগেও ভেড়ামারা ব্রাঞ্চের কয়েকজন গ্রাহককে গোল্ডেন লাইফের এমডি-চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করে জমানো টাকা আদায় করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের মামলা করাকে স্বাভাবিক বলে আখ্যা দেন গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান একেএম আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের মামলা হতেই পারে। এছাড়া জীবন বীমা খাতে মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাই সত্ নন। তারা প্রিমিয়ামের অর্থ কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে জমা দেয়নি। তাই দাবি পরিশোধের প্রশ্নই ওঠে না।

তিনি আরো বলেন, যারা মামলা করছেন, তাদের অধিকাংশের কাছেই যথাযথ প্রমাণ নেই। তার পরও সবকিছু যাচাই-বাছাই করে আমরা কিছু কিছু দাবি পরিশোধ করছি।

জীবন বীমা কোম্পানির সব শাখার জন্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা থেকে অনুমোদন নেয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই বলে তিনি জানান।

ভুক্তভোগীরা জানান, মামলা করা ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো গ্রাহক গোল্ডেন লাইফ থেকে জমানো টাকা ফেরত পায়নি। এমনকি কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরতদেরও বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয় না নিয়মিত। এছাড়া কর্মীদের বেতন থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কেটে রাখা হলেও চাকরি ছাড়ার পর তা পাওয়া যায় না। এ নিয়ে রয়েছে একাধিক মামলা।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে ১০ বছর গোল্ডেন লাইফে চাকরি করেও প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৪ লাখ টাকা পাননি মোহাম্মদ মহিউদ্দীন। তিনি বলেন, আমার বেতনের টাকা থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অংশ কেটে রাখলেও তা আমাকে পরিশোধ করেনি। তাই কোম্পানির এমডি-চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছি।

গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এমন প্রতারণাকে হায় হায় কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করছেন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) চেয়ারম্যান শেখ কবীর হোসেন। তিনি বলেন, আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আগেই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সাধারণ গ্রাহকের সঞ্চিত অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার হবে, কিন্তু তার কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না, তা মেনে নেয়া যায় না। এ গ্রাহকরা মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশের বীমা খাত কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

ভেড়ামারা ছাড়াও কুষ্টিয়া সদর, থানাপাড়া, বারখাদা, মিরপুর, হোসেনপুর ও কুষ্টিয়া পৌরসভায় গোল্ডেন লাইফের শাখা খোলা হয়েছিল। জেলার ১০ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকারও বেশি প্রিমিয়াম আদায়ের পর গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স এ অঞ্চলে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ভেড়ামারা ব্রাঞ্চের শাখা ব্যবস্থাপক আব্দুল গনি। তিনি বলেন, সম্প্রতি কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আমাদের এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র বীমার গ্রাহক সংখ্যা অনেক। তারা সবাই গরিব। মামলা চালানোর মতো বুদ্ধি তাদের নেই। আমি নিজ দায়িত্বে অনেকের মামলা চালিয়েছি। আমাদের এ অঞ্চলে ব্যবসা শুরুর পর থেকে কোনো গ্রাহকের টাকাই পরিশোধ করেনি গোল্ডেন লাইফ। আমি নিজেও দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়িয়েছি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রত্যেক জেলা-উপজেলায়ই কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গ্রাহকদের জমানো অর্থ ফেরত দিতে না পেরে কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর আগে জমা রাখা অর্থ ফেরত দেয়ার দাবিতে গত বছরও ঢাকার তেজগাঁওয়ে গোল্ডেন লাইফের প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করেন সাধারণ গ্রাহকরা। এর পরও কাজ হয়নি।

এদিকে কুষ্টিয়ার মতো রাজশাহী অঞ্চলেও অন্তত পাঁচ হাজার গ্রাহকের জমাকৃত টাকা ফেরত দিচ্ছে না গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। লভ্যাংশসহ আমানতের টাকা মিলিয়ে গ্রাহকদের এখানে পাওনা রয়েছে ৭ কোটি টাকারও বেশি। রাজশাহী অঞ্চলে এরই মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গোল্ডেন লাইফের টাকা আদায়কারী কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন।

জানা গেছে, রাজশাহীতে ২০০২ সালে কার্যক্রম শুরু করে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ‘বন্ধু বীমা’ প্রকল্পের নামে মাঠপর্যায়ে গ্রাহক সংগ্রহ করতে থাকেন। এসব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার নানা প্রলোভনে গ্রাহকরা মাসিক কিস্তিতে বীমার টাকা আমানত হিসেবে জমা করতে থাকেন। এভাবে রাজশাহীর আটটি উপজেলা থেকে পাঁচ হাজার গ্রাহকের আমানত সংগ্রহ করে গোল্ডেন লাইফ। জমাকৃত এসব টাকা ফেরত চেয়ে ৩৯ গ্রাহক একযোগে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর। কিন্তু সেসব টাকা ফেরত দেয়া দূরের কথা, এখন পর্যন্ত ওই নোটিসের জবাবও দেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের রাজশাহী জেলার মতিহার অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক এনামুল হক জানান, তার প্রায় ৫০০ গ্রাহক ৭ লাখ টাকা পাবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান টাকা দিচ্ছে না। বন্ধু বীমা প্রকল্পে রাজশাহীর গ্রাহকরা অন্তত ৭ কোটি টাকা পাবেন। কিন্তু প্রায় তিন বছর আগে এ প্রকল্পের অফিস গুটিয়ে নিয়েছে গোল্ডেন লাইফ। গোল্ডেন লাইফের প্রত্যেক অঞ্চলের কর্মকর্তারাই গ্রাহকদের চাপের মুখে আছেন।

এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর সদস্য গকুল চাঁদ দাস বলেন, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগ রয়েছে। এগুলো এরই মধ্যে আমাদের নজরে এসেছে। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেব কোম্পানিটির বিরুদ্ধে।

উত্তর দিন