কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার

0
6
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

জমি, অবকাঠামো, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা এবং সার্বিক সুশাসন ও দক্ষ জনশক্তির অভাবে দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আর এ কারণে পুঁজিবাজারের যে ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়, সেই সুযোগই সৃষ্টি হচ্ছে না। একইসঙ্গে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণ-প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে টাকা তুলতে একটি কোম্পানির বা প্রতিষ্ঠানের দেড়-দুই বছর সময় লেগে যাচ্ছে। অথচ ব্যাংক থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে পারছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ধর্ণা দিচ্ছে একাধিক ব্যাংক। সেই ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করলেও খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলোর। যে কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে ব্যাপক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ না করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে।

সোমবার রাজধানীর পল্টনে একটি হোটেলে ‘শিল্পায়নে আইপিওর গুরুত্ব’ শীর্ষ এক সেমিনারে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এবং বিএসইসির কমিশনার ড. স্বপন কুমার বালা।

প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এবং ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) সভাপতি ও চ্যালেন ২৪-এর নিউজ এডিটর হাসান ইমাম রুবেল।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জিটিভির প্রধান প্রতিবেদক রাজু আহমেদ। প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন দেশের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত, জাতীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং পুঁজিবাজারের ভূমিকা, শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়নে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা, পুঁজিবাজারে আসতে বড় কোম্পানির অনিহা, তালিকাভুক্তিতে বিভিন্ন জটিলতাসহ পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির খুটিনাটি বিষয় তুলে ধরেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থের প্রয়োজন তখই অনুভূত হবে যখন কেউ সিদ্ধান্ত নেবেন, তার উৎপাদন বাড়াবেন অথবা তিনি নতুন কোনো উৎপাদনে যাবেন। আমাদের দেশে একটি বড় অন্তরায় বেসরকারি খাতে স্থবিরতা আছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির আনুপাতিক হারে ছিল ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা হয়েছে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আট বছরে মাত্র এক শতাংশের মতো বিনিয়োগ বেড়েছে।

এ বিনিয়োগ কম বাড়ার পেছনে কিছু কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন। তার মতে জমির, অবকাঠামোর, অ্যানার্জির, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটির সমস্যা, সার্বিকভাবে সুশাসনের সমস্যা, দক্ষ জনশক্তির সমস্যার কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না।

‘এ সমস্যাগুলো লাঘব না হলে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে পুঁজিবাজারের যে ভূমিকা প্রত্যশা করা হয়, সেই সুযোগই সৃষ্টি হবে না-’বলেন তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা বলেন, অতিসহজে কর ফাঁকি দেয়া এবং ব্যাংকের লোন পরিশোধ না করার সুযোগ থাকার ফলে অনেকে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করেন না। কেননা এখানে (পুঁজিবাজারে) জবাবদিহি বাড়ে, এজিএম হয়। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিচারিক কার্যক্রমের যে দীর্ঘসূত্রিতা তা কীভাবে কমানো যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বিএসইসি, ব্যাংলাদেশ ব্যাংক, আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে আর্থিক-সংক্রান্ত বিচার কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পতির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

অধিক মার্চেন্ট ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার সমালোচনা করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আমাদের দেশে মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের সমান। প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক বেশি। এতো মার্চেন্ট ব্যাংক কেন অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তা বিএসইসির ভেবে দেখা উচিত। সাধারণত মনে করা হয়, মার্চেন্ট ব্যাংক বেশি হলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে এবং তারা অনেক বেশি ইস্যু আনতে পারবে। কিন্তু স্কেল ইকোনমি বলে একটি কথা আছে। সেই স্কেল ইকোনমি থেকে মার্চেন্ট ব্যাংক বেশি আসে তাহলে কেউ সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারবে না।

‘এখানে ইস্যু ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছে ৫৮টি মার্চেন্ট ব্যাংক। এই মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো দায়িত্ব কতোটুকু পালন করছে এবং তারপর একটি আবেদন তারা জমা দিচ্ছে। সেই আবেদন ইসলামপুরের একটি মুদি দোকানের, তা জমা দিলেই যদি লিগ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফুলফিল হয় তাহলে তো খুব বেশি কাজে আসবে বলে মনে হয় না। তো আশা করি ডিউডিলিজেন্স বলে একটি বিষয় আছে, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো সেই ডিউডিলিজেন্স কতোটুকু পালন করছেন, তা মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অন্তরদৃষ্টি দিয়ে নিজেদের বিশ্লেষণ করবেন’- বলেন মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

বিএসইসির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভালো ভালো কোম্পানির সঙ্গে নেগোশিয়েশন করে পুঁজিবাজারে আনার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি রিপিট আইপিও ইস্যুর ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করতে হবে। রিপিট আইপিও ইস্যু করার ক্ষেত্রে কোম্পানির অনিহা কম হওযার কথা।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, আমাদের দেশে ৯৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ব্যাংক লোন নিয়ে। ব্যাংক থেকে লোন নিলে সুদসহ আসল ফেরত দিতে হয়। কিন্তু আইপিওর মাধ্যমে টাকা তুললে কোম্পানিকে সেই টাকা ফেরত দিতে হয় না। মুনাফা করলে তার একটি অংশ শেয়ারহোল্ডারদের দিতে হয়। সেই সঙ্গে কর্পোরেট ট্যাক্সে ১০ শতাংশ ছাড় দেয়া হয়। এতো বড় ছাড় দেয়ার পরও কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে কমপক্ষে ১০০ কোম্পানি আছে, যাদের ট্র্যাক রেকর্ড খুব ভালো। এ কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসলে সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু সেই কোম্পানি ভালো আইপিও প্রাইজ না পেলে আসবে না। এখন বুক বিল্ডিংয়ে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে, যে কারণে ভালো ভালো কোম্পানি আমরা পাচ্ছি না। সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে। কোম্পানির এ ব্যবসা সম্প্রসারণে লোন দিতে একাধিক ব্যাংক কোম্পানিতে ধর্ণা দেয়। সেখানে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলতে দেড়-দুই বছর লেগে গেলে কোম্পানি কোথায় যাবে? ব্যাংক যেখানে টাকা দেয়ার জন্য বসে আছে, সেখানে কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য দুই বছর বসে থাকবে না।

আমাদের সমাজ কু-শক্তি বা খারাপ শক্তিনির্ভর, ভালো কিছু যুক্তিনির্ভর বিষয় গ্রহণ করে না এমন মন্তব্য করে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আসলে হয়নি। আমরা অর্থমন্ত্রীকে বললাম ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন হবে শতভাগ। কিন্তু তিনি তা না করে মার্কেট প্লেয়ারদের দিলেন ৪০ শতাংশ। আমি মনে করি ডিএসই এবং সিএসইর মেম্বার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। ডিএসইর মেম্বার কমপক্ষে এক হাজারও হওয়া উচিত। কীভাবে এই মেম্বার বাড়ানো হয় তার একটি গাইডলাইন তৈরি করা উচিত। ডিএসই, সিএসইর মেম্বারশিপ হওয়া বিরাট ব্যাপার হয়ে গেছে। মেম্বারশিপ ধরে রাখার জন্য তারা মানুষ পর্যন্ত খুন করতে পারে।

স্বপন কুমার বালা বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে ইস্যু আনার দায়িত্ব মার্চেন্ট ব্যাংকের। বর্তমানে ৫৯টি মার্চেন্ট ব্যাংক আছে, এর মধ্যে ৫৮টির ইস্যু ম্যানেজারের লাইসেন্স আছে। আমরা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে বছরে কমপক্ষে একটি ইস্যু আনার নিয়ম বেঁধে দিয়েছি। ইস্যু অনুমোদন পাক বা না পাক ম্যার্চেন্ট ব্যাংককে বছরে একটি ইস্যু আনতে হবে।

বিএসইসি আগের চেয়ে দ্রুততম সময়ে আইপিও অনুমোদন দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইপিও অনুমোদন দেরি হওয়ার পেছনে কমিশনের চেয়ে ইস্যুয়ারের নির্ভুল আবেদন করা জরুরি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আর্থিক হিসাবে গড়মিল থাকায় এগুলো সংশোধন করে অনুমোদন পেতে সময় লেগে যায়।

ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, আইপও যদি দীর্ঘসূত্রিতায় আসে তাহলে এটি দুর্বল হয়ে যাবে। এছাড়া আমি বুক বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের যোগ্য বিনিয়োগকারীর অভাব দেখছি।

আইপিওর দীর্ঘসূত্রিতা কমানোর জন্য ভেটিং করিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ। আর আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান আইপিও আবেদন করে যাতে সব সাধারণ বিনিয়োগকারী শেয়ার পায় সে ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।

সিএমজেএফ সভাপতি হাসান ইমাম রুবেল বলেন, ডাবলডিজিট সুদ হারে লোন নিয়ে শিল্পায়ন করা সম্ভাব হয় না। এখানে যারা ব্যাংক থেকে টাকা তোলেন তারা আসলেই তা পরিশোধ করেন না। এটার কারণ মানি মার্কেটের নিয়ন্ত্রণে যে বাংলাদেশ ব্যাংক আছে, সেখানে নিশ্চয় কোনো দুর্বলতা রয়েছে।

যারা অনলাইন থেকে টাকা উপার্জন করতে চান তাদের জন্য এই ভিডিও

উত্তর দিন