এনসিটিবির পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি

0
3
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যবই সরবরাহ না হলেও সঠিক সময়ে প্রাপ্তি প্রতিবেদন দেয়া হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাঠ্যবই বিতরণের কাজে নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্মানী নেন। বই ছাপার দরপত্র আহ্বানের আগেই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাক্কলিত দর জানিয়ে দেয়া হয়। পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শীরা প্রাধান্য পান। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক লেখক-শিক্ষাবিদকে কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়। আবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কোনো কোনো বিষয় ও শব্দ পরিবর্তন করা হয়।

প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি তৈরি, ছাপা ও বিতরণের কাজে পদে পদে এমন নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিরুদ্ধে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি): পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশনা ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন গবেষক মোরশেদা আক্তার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গবেষণা উপদেষ্টা ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (গবেষণা ও পলিসি) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান ও গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক শাহজাদা এম আকরাম।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এনসিটিবির কর্মকর্তারাও পাঠ্যপুস্তকসংক্রান্ত নানা অনিয়মে জড়িত। নির্ধারিত সম্মানী ও বেতনের বাইরে তারা বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিচ্ছেন। দরপত্র নির্দেশিকা তৈরি, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, সিএস তৈরি, কার্যাদেশ প্রদান, প্রতি লট কাগজের হিসাব, কাগজের বরাদ্দপত্র জারি, কার্যাদেশ অনুযায়ী উপজেলায় বই সরবরাহ বাবদ গত তিন বছরে ৫০ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান থেকে এমএলএসএস পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শীদের প্রাধান্য দেয়া হয়। যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে কাউকে কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখা নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের প্রভাব দেখা যায়। আবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কিছু বিষয় ও শব্দ পরিবর্তন করা হয়। শিক্ষাক্রম অনুসরণ না করেই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লেখা পরিবর্তন করা হয়।

টিআইবি
টিআইবি

প্রতিবেদনে পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে অনিয়ম তুলে ধরে বলা হয়, এনসিটিবির কর্মকর্তাদের একাংশ পাঠ্যবই ছাপার দরপত্র আহ্বানের আগেই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাক্কলিত দর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেন। পরে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল করে। বিতরণ পর্যায়েও নানা ধরনের অনিয়ম হয়। কয়েকটি জেলায় নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যবই সরবরাহ করা না হলেও পরে সঠিক সময়ে প্রাপ্তি প্রতিবেদন দেয়া হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনের সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এনসিটিবির পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ, সঠিকভাবে পাণ্ডুলিপি লেখা হয় না, দলীয় রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রভাব দেখা যায়। পাঠ্যবই ছাপায় দুই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা আদায় ও কার্যাদেশ প্রদানে দুর্নীতি।

এনসিটিবির অনিয়মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এনসিটিবি অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর কোনো বিধিমালা নেই। নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার কারণে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা বিদ্যমান। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বর্তমান আইনে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি) ও শিক্ষাক্রম কমিটির (কারিকুলাম) উল্লেখ করা হয়নি। আইনের বিভিন্ন ধারার সুযোগ নিয়ে এনসিটিবির ওপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এছাড়া প্রকাশনায় সাব-কন্ট্রাক্ট, কাগজ ক্রয় ও কাগজের মান নিয়ন্ত্রণ ও পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও ব্যর্থতা লক্ষণীয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি মোকাবেলায় এনসিটিবিকে কমিশনে রূপান্তরের প্রস্তাব করে টিআইবি।

গবেষণা উপস্থাপন শেষে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের খুশিমতো কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসে রাজনৈতিক বিবেচনায়। আবার যখন তারা ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন নতুন সরকার সেগুলোকে পরিবর্তন করে নিজের মতো করে ফেলে। ফলে আমাদের যে পরবর্তী প্রজন্ম, তারা দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উত্তর দিন